আল্লামা সাঈয়্যেদ মুরতাজা আসকারী, অনুবাদ : মোহাম্মদ আব্দুল লতিফ
আশআরি সম্প্রদায়: আশআরি সম্প্রদায় হচ্ছে আবুল হাসান আলী ইবনে ইসমাঈল আশআরির (মৃত্যু ৩২৪ হি.) অনুসারী। তিনি আবু মুসা আশআরির বংশধর ছিলেন এবং তিনি স্বীয় বয়সের চল্লিশ বছরকাল পর্যন্ত বসরা নগরীর অধিবাসী ও জুব্বাঈ মো’তাযেলির (মৃত্যু ৩০৩ হি:) শিষ্য ছিলেন। (ইসলামি বিশ্বকোষ, ২য় খন্ড, পৃ. ২১৮) অতঃপর তিনিও ওয়াসেল ইবনে আতা ও আমর ইবনে উবাইদ নামক মো’তাযেলা মাজহাবের দুই প্রতিষ্ঠাতার (যারা হাসান বসরির শিষ্য ছিলেন এবং সময়ের ব্যবধানে তাঁর ক্লাস বর্জন করেন ও মো’তাযেলা মাজহাবের প্রতিষ্ঠা করেন) ন্যায় মো’তাযেলির ক্লাস বর্জন করেন (ওয়াফিয়াতুল আ’ইয়ান, ৩য় খন্ড, পৃ. ৩৯৮, আশআরির জীবনি) এবং অপর মুহাদ্দিসগণের ন্যায় জনগণকে হাদিসের প্রতি রুজু করার আহবান জানান। অতঃপর আশআরি বাগদাদে চলে যান এবং লোকজনকে মো’তাযেলা মাজহাব প্রত্যাখ্যান করার আহবান জানাতে থাকেন। কিন্তু তিনি স্বীয় মোনাজিরাসমূহের জন্যে যেরূপে মোহাদ্দিসগণের হাদিস হতে উপকৃত হতেন সেরূপে মো’তাযেলা সম্প্রদায়ের ধর্মতত্ত¡ থেকেও প্রয়োজনীয় নোট নিতেন। (আশআরিদের বিভিন্ন কীর্তিতে রুজু করলে এ বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে উঠবে) অনেক ক্ষেত্রেই তার আক্বিদা-বিশ্বাস হাদিসের বাহ্যিক বক্তব্যের সঙ্গে মিল খায় না। আর এ কারণেই, তিনি নিজেকে আহমদ ইবনে হাম্বলের মতাদর্শের লালনকারী দাবী করা সত্ত্বেও সকল মোহাদ্দিস বিশেষতঃ আহমদ ইবনে হাম্বলের মতাদর্শের অনুসারী মোহাদ্দিসগণ তাকে গ্রহণ করেননি। কিন্তু শাফেঈ মাজহাবের ফকিহ আবু ইসহাক মুরুযি’র পাঠদানের ক্লাসে তিনি উপস্থিত হওয়ার কারণে ফিকাহশাস্ত্রের ক্ষেত্রে শাফিঈ’র অনুসারী অনেক পণ্ডিতই আক্বিদাগত দিক থেকে আশআরি হয়ে যান; অথচ তাদেরই অপর একটি দল আক্বিদাগত দিক থেকে মো’তাযেলার অনুসারী।
আর এভাবে খোলাফা মতাদর্শ আক্বিদা-বিশ্বাসের দিক থেকে বৃহৎ দুই মাজহাবে বিভক্ত হয়ে যায়: মো’তাযেলা ও আশআরি সম্প্রদায়। আর ফিকহের ক্ষেত্রে হানাফি, মালেকি, শাফেঈ এবং অপর ফিকহি মাজহাবসমূহের অনুসারী বনে যায়। সময়ের আবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে আহমদ ইবনে হাম্বলের মতাদর্শও খোলাফা মতাদর্শের ফিকহি মাজহাবসমূহের দলে পরিগণিত হয়।
হিজরী চতুর্থ শতাব্দীর পর থেকে বিভিন্ন মুসলিম সম্প্রদায়ের মোনাজেরা বা বিতর্কগুলো “ধর্মতত্ত্ব” পদ্ধতিতে অনুষ্ঠিত হত। আর এ বিষয়টি “আশায়েরাহ” ও “মো’তাযেলা” সম্প্রদায়ের বিতর্কসমূহের মাঝে সুস্পষ্ট থাকার ফলে আহলে হাদিস সম্প্রদায় এই দুই সম্প্রদায় থেকে দূরে সরে যায়।
এই যুগেই খোলাফা মতাদর্শের মাঝে বিভিন্ন ফিকহি মাজহাবের আত্মপ্রকাশ ঘটে। অতঃপর ৬৬৫ হিজরীতে বাদশাহ যাহের বিবরিস বন্দুকদারি বিভিন্ন অঞ্চল বা দেশের বাদশাহদের নিকট (সেই যুগের রাজা-বাদশাহরা প্রকৃতপক্ষে মুক্তকৃত দাস ছিল) “হানাফি”, “শাফেঈ”, “মালেকি” ও “হাম্বেলি” এই চারটি ফিকহি মাজহাবকে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দেয়ার আহবান জানায় এবং আক্বিদা-বিশ্বাসের ক্ষেত্রে “আশআরি” মাজহাবকেও। আর এই অনুমোদনটি অদ্যাবধি খোলাফা মতাদর্শের অনুসারীদের মাঝে বলবৎ রয়েছে। (খুতাতে মুকরিযি, কায়রো থেকে প্রকাশিত, ১৩২৬ হি., ৬ষ্ঠ খন্ড, পৃ. ১৬১)
সালাফি সম্প্রদায়: হিজরী সপ্তম শতাব্দীর শেষের দিকে “ইবনে তাইমিয়া” (মৃত্যু ৭২৮ হি.) নামক আহমদ ইবনে হাম্বলের মতাদর্শের এক অনুসারী, মুসলিম সকল সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে উত্থান করেন। আর খোলাফা মতাদর্শ “ইজতিহাদের” দ্বারকে বন্ধ ঘোষণা করা সত্ত্বেও তিনি নিজেকে মুজতাহিদ জ্ঞান করতেন। (আদ্ দুরারুল কামেনাতু ফি আ’ইয়ানিল মিয়াতিস্ সামেনাহ, ইবনে হাজার আস্কালানি (মৃত্যু ৮৫২ হি.), কায়রো থেকে প্রকাশিত, ১৩৮৫ হি., পৃ. ১৬৩)
তিনি আক্বিদা-বিশ্বাসের ক্ষেত্রে দেহের (আল্লাহর দেহ) রূপায়নের ব্যাপারে অতিরঞ্জন করতেন; এমনকি একদা তিনি মিম্বরের উপর থেকে এক-দুই সিঁড়ি নিচে নেমে এসে বলেন: “মহান আল্লাহ এরূপে প্রথম আসমান থেকে নিম্নে আসমানে অবতরণ করেন।” (প্রাগুক্ত, পৃ. ১৬৪) তিনি রসুলকে (সা.) কেন্দ্র করে “তাওয়াস্সুল” ও “ইস্তিগাসা” করা এবং “ইয়া মুহাম্মদ” বলাকে হারাম বা নিষিদ্ধ জ্ঞান করতেন। (প্রাগুক্ত, পৃ. ১৫৮)
ইবনে তাইমিয়া হযরত ইমাম আলীর (আ.) ফজিলতসমূহকেও প্রত্যাখ্যান করতেন। তবে খোলাফা মতাদর্শের আলেমগণ মনে করতেন যে, ইমামের (আ.) সঙ্গে তার শত্রুতা থাকার কারণেই তিনি সেসবকে প্রত্যাখ্যান করতেন এবং তারা আরও বলতেন যে, আল্লাহর রসুল (সা.) হযরত ইমাম আলীর (আ.) ব্যাপারে যেহেতু বলেছেন: "لايبغضك إلّا منافق" (হে আলী! একমাত্র মোনাফিক ব্যতীত অপর কেউই তোমার সঙ্গে শত্রুতা পোষণ করবে না।) সেহেতু ইবনে তাইমিয়া একজন মোনাফিক লোক। (প্রাগুক্ত, পৃ. ১৬৬)
দামেস্ক, কায়রো ও গ্রীসের খোলাফা মতাদর্শের আলেমগণ একাধিকবার ইবনে তাইমিয়ার সঙ্গে মোনাজিরা করেন ও তাকে কারাগারে বন্দী করার নিমিত্তে ফতোয়া দেন। আবার কখনও কখনও তারা তাকে তার আক্বিদা-বিশ্বাসের ব্যাপারে তওবাও করাতেন। (প্রাগুক্ত, পৃ. ১৫০-১৭০)
ইবনে তাইমিয়ার মৃত্যুর পর তার অনুসারীরা তাকে “শায়খুল ইসলাম” উপাধী দান করে এবং নিজেদেরকে “সালাফি” বলে নামকরণ করে; অর্থাৎ তারা এমনই এক সম্প্রদায় যারা “সালাফ” বা পূর্বপুরুষদের অনুসরণ করে। আর “সালাফ” শব্দ দ্বারা তারা সাহাবি, তাবেঈ এবং হিজরী প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় শতাব্দীর কতিপয় মোহাদ্দিসকে (যেমন আহমদ ইবনে হাম্বল) বুঝাতে চেয়েছে।
সালাফি সম্প্রদায় অপর সব মুসলমানের সঙ্গে রূঢ় আচরণ করে। তারা নিজেদেরকে মুমিন ও পবিত্র জ্ঞান করে এবং প্রথম তিন শতাব্দীর পর থেকে অদ্যাবধি সকল মুসলমানকে পথভ্রষ্ট ও বিদআতকারী ধারণা করে। (প্রয়োজনে ইবনে তাইমিয়ার এ কিতাবগুলো দেখতে পারেন: মিনহাজুস্ সুন্নাহ, ইবনে তাইমিয়ার বিভিন্ন পাণ্ডুলিপি, ইসলামি বিশ্বসংস্থার পক্ষ থেকে প্রস্তুতকৃত আলোকচিত্রের ৯১তম সিরিয়াল)
ওহাবী সম্প্রদায়: হিজরী দ্বাদশ শতাব্দীতে সালাফি সম্প্রদায়ের “মুহাম্মদ ইবনে আব্দিল অহহাব” (মৃত্যু ১২০৭ হি.) মুসলমানদের বিরুদ্ধে উত্থান করেন এবং তিনি “ইবনে তাইমিয়ার” আহবানকে তার চেয়েও তীব্রতর করে তুলেন। তার অনুসারী সম্প্রদায়কে “অহ্হাবি” (ওহাবী) বলা হয়।
মুহাম্মাদ ইবনে আব্দিল অহ্হাব “কবর য়িয়ারত” করাকে বিদআত, আল্লাহর রসুলের (সা.) ইন্তেকালের পর তাঁর নিকট শাফায়াত কামনা করাকে গোমরাহি এবং তাঁর মাধ্যমে “ইস্তেগাসাহ” (সাহায্য প্রার্থনা) ও “তাওয়াস্সুল” করার সময় “ইয়া মোহাম্মদ” (হে মোহাম্মদ) বলাকে শির্ক জ্ঞান করেন; আর তৃতীয় শতাব্দীর পর হতে অদ্যাবধি একমাত্র ইবনে তাইমিয়ার অনুসারীগণ ব্যতীত অপর সব মুসলমানকেই তিনি মুশরিক আখ্যা দেন! তিনি আরও বলেন, “আমাদের যুগের মুশরিকদের - অর্থাৎ সকল মুসলমান - শির্ক জাহেলি যুগের মুশরিকদের শির্কের চেয়েও কঠোর!” (মাআলীমুল মাদরাসাতাইন, ১ম খন্ড, পৃ. ৬২।#####