রমজান আল্লাহ তায়ালার অলংঘনীয় ও অকাট্য ফরয। কোনো লোক নিজেকে মুসলমান দাবী করে রোজা রাখবে না এটা কল্পনা করা যায় না। রোজা ফরয ঘোষণা করে আল্লাহ তায়ালা এরশাদ করেনঃ
“ওহে যারা ঈমান এনেছ। তোমাদের উপর রোজাকে ফরয করা হয়েছে যেমনিভাবে তোমাদের পূর্ববর্তীদের উপর ফরয করা হয়েছেÑযাতে তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পার।” আল্লাহ তায়ালার এ ঘোষণা অনুযায়ী রোজা আমাদের উপর ফরয। ইসলামের দৃষ্টিকোণ থেকে যিনি এ ফরযকে অস্বীকার করবেন তিনি কাফের হবেন। আর যে ইচ্ছাকৃতভাবে ত্যাগ করবে সে ফাসিক হবে আর যে স্বইচ্ছায় স্বজ্ঞানে রোজা রেখে ভঙ্গ করবে সে মহাপাপী হিসাবে পরিগণিত হবে। আর শরীয়াতের হুকুম মোতাবেক তাকে এ রোজার কাফ্ফারা ও কাযা উভয় পালন করতে হবে। দুুটোই তার উপর ওয়াজিব। কাযা ও কাফ্ফারার জন্য একাধারে ৬০ টি (ষাটটি) রোজা পালন করতে হবে। এর মধ্যে যদি একটি বাদ পড়ে আবার পুনরায় কাফ্ফারার রোজা শুরু করতে হবে। আর যদি তিনি কোনো যুক্তিসংঙ্গত কারণে রোজা না রাখতে পারেন তাহলে ৬০ জন দরিদ্র ব্যক্তিকে দু’বেলা পেট ভরে খাওয়াতে হবে। তাহলে মাত্র একটি রোজার কাফ্ফারা পূর্ণ হবে।
উল্লেখ্য যে, ৬০ জন ব্যক্তিকে খাইয়ে কাফ্ফারা করতে হলে তাদের প্রত্যেককে পূর্ণবয়স্ক লোক হতে হবে। আর খাওয়ানোর পরিবর্তে খাদ্যশস্য বা তার সমান মূল্য প্রদান করাও জায়েজ।
আদম সন্তানের প্রত্যেকটি নেক আমলের সওয়াব দশগুণ থেকে সাতশ গুণ বৃদ্ধি করা হয়। কিন্তু আল্লাহ তায়ালা বলেছেন রোজা এই সাধারণ নিয়মের ব্যতিক্রম। কেননা রোজা একান্তভাবে আমার জন্য। অতএব আমিই তার প্রতিদান দেব। (বুখারী শরীফ)
যে লোক একজন রোজাদারকে ইফতার করাবে তার জন্য ঐ রোজাদারের মতোই সওয়াব লেখা হবে। এতে মূল রোজাদারের সওয়াব হতে এক বিন্দু কম হবে না। (তিরমিযী)
যে লোক এ মাসে রোজা পালন করবে আর আল্লাহ তায়ালার সামনে দাঁড়াবে ঈমান ও চেতনা সহকারে সে তার গুনাহ হতে নিস্কৃতি লাভ করে সেই দিনের মতো নিষ্পাপ হয়ে যাবে যে দিন তার ‘মা’ তাকে প্রসব করেছিল। (মুসনাদে আহমাদ)
রাসূলে আকরাম (সাঃ) এরশাদ করেন, যে ব্যক্তি রমজান মাসে কোনো যিকিরের মজলিসে হাজির হবে তার প্রত্যেক পদক্ষেপের বদৌলতে আল্লাহ তাকে এক বছরের সওয়াব দান করবেন। সে কেয়ামত দিবসে আমার সাথে আল্লাহ তায়ালার আরশের নীচে স্থান পাবে। যে ব্যক্তি রমজান মাসে জামায়াতের সাথে নামায আদায় করবে আল্লাহ তায়ালা প্রতি রাকায়াত নামাযের প্রতিদান হিসাবে একটি করে নুরের শহর দান করবেন। যে ব্যক্তি সাধ্যানুযায়ী মাতাপিতার খেদমত করবে তার প্রতি দয়া ও রহমতের দৃষ্টি দেবেন। আর আমি তার জিম্মায় হয়ে যাব। যে স্ত্রীলোক রমজান মাসে তার স্বামীর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করবে আল্লাহ তায়ালা তাকে হযরত মরিয়ম ও আসিয়ার সমান সওয়াব দান করবেন। যে ব্যক্তি রমজান মাসে কোনো মুসলমানের প্রয়োজন পূরণ করবে আল্লাহ তায়ালা তার হাজার হাজার প্রয়োজন পূরণ করবেন। যে ব্যক্তি কোনো অভাবগ্রস্থ দরিদ্র পরিবারকে ছদকা করবে আল্লাহ তায়ালা তার আমলনামায় হাজার হাজার নেকী দেবেন এবং মিটিয়ে দেবেন হাজার হাজার গুণাহ, আর উন্নত করবেন তার মর্যাদা হাজার গুণে। (নুযহাতুল মাজলেছ ১ম খন্ড-১৫৯)
মনীষীদের দৃষ্টিতে রোজাঃ
ইমাম গাজ্জালী (রহঃ) বলেনঃ রোজা তিন প্রকার।
১। সাধারণ লোকের রোজা। আর তাহলো উদর ও লজ্জাস্থানকে প্রবৃত্তি কামনা হতে বিরত রাখা।
২। বিশেষ লোকের রোজা। তাহলো সকল প্রকার গুনাহ থেকে শরীরকে মুক্ত রাখা।
৩। আর সর্বোচ্চ স্তরের লোকের রোজা। তা হলো আল্লাহ ছাড়া সবকিছু হতে নিজেকে মুক্ত করা। (এহইয়াউ উলুমিদ্দিন, নুযহাতুল মাজালেস-১৬০)
হযরত শাহ ওয়ালী উল্লাহ মুহাদ্দেসে দেহলাভী (রহঃ) বলেন, “রোযা শ্রেষ্ঠ পূণ্যের কাজ। কেননা রোজা ফেরেশতা শক্তিকে প্রবল ও পশু শক্তিকে দুর্বল করে দেয়। আত্মার পরিচ্ছন্নতা এবং প্রবৃত্তিকে দমন করে রাখার জন্য রোজার ন্যায় উপকারী এমন অস্ত্র আর কিছুই নেই।
রোজা স্বাস্থ্যের কী উপকার করেঃ
এক মাস রোজা রাখার ফলে শরীরের অনেক অঙ্গ প্রত্যঙ্গের বিশ্রাম ঘটে। প্রতিদিন প্রায় ১৫ ঘন্টা সময় এই বিশ্রামে লিভার, প্লীহা, কিডনী, মূত্রথলিসহ দেহের অভ্যন্তরীণ অন্যান্য অঙ্গ প্রত্যঙ্গ দীর্ঘ একমাসব্যাপী বেশ বিশ্রাম পায়। এতে মানব দেহের যন্ত্রপাতির ও আয়ুষ্কাল বেড়ে যায়। সারা বছর দেহের অভ্যন্তরে যে বিষ সৃষ্টি হয় তা এক মাসের সিয়াম সাধনায় পুড়ে ভস্মীভূত হয়ে যায়।
প্রখ্যাত ডাক্তার জয়েলশ বলেনঃ যখনই কেউ এক বেলা খাওয়া বন্ধ রাখে তখনই দেহ সেই মুহূর্তটিকে রোগমুক্তির সাধনায় নিয়োজিত করে।
ডাক্তার আইজাক জেনিংস বলেনঃ যারা আলস্য ও গোড়ামীর কারণে এবং যারা অতি ভোজন দ্বারা তাদের সংরক্ষিত জীবনী শক্তিকে ভারাক্রান্ত করে রাখে তারা হাঁটি হাঁটি পা পা করে আত্মহত্যার দিকেই এগিয়ে যায়। রোজা এ বিপদ থেকে তাদেরকে রক্ষা করে থাকে।
ডাক্তার গ্রাহাম বলেনঃ আলসার ও তজ্জনিত ফুলা রোগ এবং প্রদাহ রোজা রাখার ফলে দ্রুত উপশম হয়।
ডাক্তার এম, এ, রাহাত বলেন ঃ অতি ভোজনের ফলে অনেকেরই পাকস্থলী বড় হয়ে যায়। রোজার ফলে এই বড় পাকস্থলী স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসে।
রোযা রাখলে পেপটিক আলসার হবে বা বেড়ে যাবে কথাটি সম্পূর্ণ অবৈজ্ঞানিক ও যুক্তিহীন। ফুসফুসে কোন রকম প্রতিবন্ধকতা বা বাধার সৃষ্টি হলে রমজানে রোজা তা দূর করে দেয়।
বিশ্ববিখ্যাত চিকিৎসক নাষ্টবারনার বলেন ঃ ফুসফুসের কাশি, নিউমোনিয়া, কঠিন কাশি, সর্দি এবং ইনফ্লুয়েঞ্জা কয়েক দিনের রোজা পালনেই নিরাময় হয়।
ডাক্তার দেওয়ান এ, কে, এম, আব্দুর রহীম বলেন ঃ রোজা পালনে মস্তিষ্ক এবং স্নায়ুতন্ত্র সর্বাধিক উজ্জীবিত হয়।
আল্লাহর কোরআন, রাসুলের সুন্নাহ এবং জ্ঞান বিজ্ঞানের গবেষণা সব দিক থেকেই মাহে রমজান মুসলিম জাতির জন্য বিরাট রহমত, স্বাস্থ্যের জন্য অনন্য নেয়ামত। আত্মিক পরিশুদ্ধির জন্য অন্যতম মাধ্যম এতে সন্দেহ নেই। নিজেকে সত্যিকার মানুষে পরিণত করার জন্য। নিষ্কলুষ চরিত্রের পরাকাষ্ঠা দেখানোর নিমিত্তে সুস্বাস্থ্যের অধিকারী হওয়ার জন্যে রোজা আমাদের জীবনের জন্য একটি উপকারী ইবাদাত। একজন বিবেকবান সুস্থ মস্তিষ্কের অধিকারী হিসাবে আমরণ নিজের স্বার্থেই রোজা রাখব। আল্লাহ আমাদেরকে তাওফিক দিন।
রোজার উপকারিতাঃ
১। আল্লাহ তায়ালা হাশরের ময়দানে হিসাব-নিকাশের পূর্বে বিশেষ মেহমান হিসাবে আমাদের চাহিদা অনুযায়ী উন্নত মানের খাবার পরিবেশন করবেন।
২। হাশরের ময়দানে আল্লাহ তায়ালা রোজাদারের মুখের দুর্গন্ধকে সুগন্ধে পরিণত করবেন এবং তা হবে মেশকে আম্বরের চেয়ে উন্নত।
৩। অন্যান্য ইবাদাতের প্রতিদানে আল্লাহ তায়ালা তার ইবাদাতের পরিমাণ মতো দান করবেন। কিন্তু রোজা এমন একটি ইবাদাত যার প্রতিদান আল্লাহ তায়ালা নিজেই দান করবেন। যার কোন সীমা পরিসীমা থাকবে না, যেমন, আল্লাহ তায়ালা নিজেই বলেন, “রোজা আমার জন্য এবং আমি নিজেই এর প্রতিদান দিব।”######
- হোম
-
পাক্ষিক ফজর
-
সংবাদ
-
জীবনী ও প্রতিষ্ঠান
-
মাসলা-মাসায়েল
-
প্রকাশনা ও প্রবন্ধ
-
আরও...