লেখকঃ মল্লিক শিহাব ইকবাল
হযরত আলী (আ.) বিশ্বনবী (সা.)’র পর মহানবী (সা.)’র হাতে গড়ে তোলা সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব, জ্ঞানী, ন্যায়বিচারক, খোদাপ্রেমিক, দার্শনিক ও জিহাদের ময়দানের সবচেয়ে বড় বীর। তিনি ছিলেন বিশ্বনবী (সা.)’র চাচাতো ভাই ও জামাতা তথা বেহেশতের নারী জাতির নেত্রী নবী নন্দিনী হযরত ফাতেমা (সা.আ.)’র স্বামী এবং পুরুষদের মধ্যে প্রথম মুসলমান। হযরত আলী (আ.) ছিলেন জগত বিখ্যাত ইমাম হযরত হাসান ও হোসাইন (আ.)’র পিতা। আমীরুল মুমিনীন হযরত আলী (আ.)’র জন্ম হয়েছিল পবিত্র কাবাঘরে।
হযরত আলী (আ.) এর জ্ঞান সম্পর্কে বিশ্বনবী (সা.) বলেছেন, আমি জ্ঞানের নগর, আর আলী হল তার দরজা, যে কেউ আমার জ্ঞানের শহরে প্রবেশ করতে চাইবে তাকে আলীর মাধ্যমেই প্রবেশ করতে হবে। বিদায় হজ্জ্বের সময় বিশ্বনবী (সা.) আলী (আ.)কে তার ওফাতের পরপরই মুসলমানদের নেতা বলে ঘোষণা দিয়েছিলেন।
হযরত আলী (আ.)’র বিরুদ্ধে সিরিয়ায় বিদ্রোহ শুরু করার পেছনে মুয়াবিয়ার অজুহাত ছিল তৃতীয় খলিফার হত্যাকান্ডের বিচার। এটা যে নিছক অজুহাতই ছিল তার প্রামাণ হল হযরত আলী (আ.)’র শাহাদতের পর মুসলিম বিশ্বের সব অঞ্চল ছলে বলে কৌশলে করায়ত্ত করা সত্ত্বেও মুয়াবিয়া আর কখনও তৃতীয় খলিফার হত্যাকারীদের বিচারের কথা মুখেও উচ্চারণ করেনি। দ্বিতীয় খলিফার শাসনামল থেকেই সিরিয়ায় প্রায় স্বাধীন রাষ্ট্র প্রধানের মত চালচলনে অভ্যস্ত মুয়াবিয়া জানত যে হযরত আলী (আ.)’র মত কঠোর ন্যায়বিচারক শাসক তাকে কখনও ছোট বা বড় কোন পদ দেবেন না। তাই আলী (আ.) খলিফা হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অন্য অনেক দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তার মত মুয়াবিয়াকেও পদচ্যুত করলে ইসলামের ইতিহাসে রাজতন্ত্র প্রবর্তনকারী মুয়াবিয়া সিরিয়ায় বিদ্রোহের পতাকা উত্তোলন করে।
মুয়াবিয়া সিরিয়াতে বহু বছর ধরে গভর্ণর ছিল। সেখানে আলী (আ.) ও তাঁর পরিবার এবং বংশধরদের বিরুদ্ধে নানা ধরনের কুৎসা রটনা ও গালি দেয়ার প্রচলন শুরু করেছিল মুয়াবিয়া। এই নোংরা প্রথাটি বন্ধ করেছিল ইতিহাস খ্যাত দ্বিতীয় ওমর। বিশ্বনবী (সা.)’র আহলে বাইত ও আলী পরিবারের বিরুদ্ধে বিষাক্ত প্রচারণার প্রভাবে সিরিয়ার জনগণ এতটাই বিভ্রান্ত হয়েছিল যে, আলী (আ.) কুফার মসজিদে শহীদ হয়েছেন শুনে দামেস্কের অনেকেই প্রশ্ন করেছিল : আলী মসজিদে মারা গেল কিভাবে। সে কি নামাজ পড়তো?
বিশ্বনবী (সা.) তাঁর ভবিষ্যদ্বাণীতে বলেছিলেন, আমার পরে তোমরা নাকিতুন, কাসিতুন ও মারিকুনদের বিরুদ্ধে লড়াই করবে। খারেজীদের দেখা পেলে রাসুল (সা.) তাদের ধ্বংস করে দিতেন বলে মন্তব্য করেছিলেন। যারা জামাল যুদ্ধে হযরত আলী (আ.)’র বিপক্ষে লড়াই করেছিল আলী (আ.) তাদেরকে নাকিতুন বা আনুগত্য ভঙ্গকারী, সিফফিনের যুদ্ধে বিপক্ষীয়দেরকে তিনি কাসিতুন বা বিপথগামী এবং নাহরাওয়ানের যুদ্ধে বিপক্ষীয় খারেজীদেরকে তিনি মারিকুন বা ধর্মের সত্য উপলব্ধিতে ব্যর্থ বলে মন্তব্য করেছিলেন।
হযরত আলী (আ.) এরমতো একজন পূর্ণমানবকে গোপনে দাফন করতে হয়েছিল। কিন্তু কেন? কারণ তার যেরূপ পরম বন্ধু রয়েছে সেরূপ পরম শত্রুও রয়েছে। হযরত আলী (আ.) যেমন প্রচন্ড আকর্ষণ ক্ষমতার অধিকারী তেমনি বিকর্ষণ ক্ষমতারও অধিকারী ছিলেন। তার মত মানুষের বন্ধু যেমনি থাকে চরম অন্তরঙ্গ ও উচ্চ পর্যায়ের যারা যে কোন সময়ে তার জন্য প্রাণ দিতে অকুণ্ঠিত তেমনি শত্রুও থাকে যারা তার রক্তের জন্য পিপাসার্ত বিশেষতঃ অভ্যন্তরীণ ও নিকটতম শত্রু। যেমন খারেজীরা দ্বীনের বাহ্যিক কাঠামোতে বিশ্বাসী ও ঈমানের অধিকারী কিন্তু দ্বীনের মূল শিক্ষা সম্পর্কে অজ্ঞ।
খারেজীদের সঙ্গে মুয়াবিয়ার অনুসারীদের তুলনা করে বলেছেন, আমার মৃত্যুর পর এদের হত্যা করো না। এদের সঙ্গে মুয়াবিয়ার অনুসারীদের পার্থক্য রয়েছে, এরা সত্যকে চায় কিন্তু বোকা (অন্যদের দ্বারা ব্যবহৃত হয়) ও ভুল করে। কিন্তু মুয়াবিয়াপন্থীরা সত্যকে জেনেই সত্যের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত থাকে। তাই কেন আলীকে এত বন্ধু ও সুহৃদ থাকা সত্ত্বেও রাত্রিতে গোপনে দাফন করা হয়েছে? এই খারেজীদের ভয়ে যেহেতু তারা বলত আলী মুসলমান নয়, তাই ভয় ছিল তারা জানতে পারে কবর থেকে তার লাশ বের করে অপমান করত।
নবী পরিবারের ইমামরা ব্যতীত কেউই জানতো না যে, ইমাম আলী (আ.)-কে কোথায় দাফন করা হয়েছে। একুশে রমজানের ভোরে ইমাম হাসান (আ.) জানাযার আকৃতিতে সাজিয়ে একটি খাটিয়া কিছু ব্যক্তির হাতে দেন মদীনায় নিয়ে যাওয়ার জন্য, যাতে লোকজন মনে করে আলী (আ.)-কে মদীনায় দাফনের জন্য নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। শুধু ইমাম আলী (আ.)’র সন্তানগণ ও কিছুসংখ্যক অনুসারী যারা তার দাফনে অংশগ্রহণ করেছেন তারা জানতেন তাকে কোথায় দাফন করা হয়েছে। বর্তমানে কুফার নিকটে নাজাফে যে স্থানে আলী (আ.)’র সমাধি রয়েছে সেখানে তারা গোপনে যিয়ারতে আসতেন। ইমাম সাদিক (আ.)-এর সময় যখন খারেজীরা নিশ্চিহ্ন হয়ে যায় এবং আলীর প্রতি অসম্মানের সম্ভাবনা রহিত হয় তখন ইমাম সাদিক তার এক সাহাবী সাফওয়ান (রহ.)-কে সেস্থান চিহ্নিত করে গাছ লাগিয়ে দিতে বলেন। এরপর থেকে সবাই জানতে পারে ইমাম আলী (আ.)’র কবর সেখানে এবং তার ভক্ত ও অনুসারীরা তার কবর যিয়ারত করতে শুরু করে।
যে রাতে আলীকে দাফন করা হয় খুব কম সংখ্যক লোক তার দাফনের সময় উপস্থিত ছিলেন। ইমাম হাসান ও ইমাম হুসাইন, সে সাথে কয়েকজন ঘনিষ্ঠ সাহাবী। তাদের মধ্যে সামায়া ইবনে সাওহান যিনি আলী (আ.)-এর অন্তরঙ্গ বন্ধু ও অনুসারী ছিলেন তিনি একজন তুখোড় বক্তাও ছিলেন। আলীকে দাফনের সময় তাদের অন্তর যেরূপ বিরাগ বেদনায় স্তব্ধ ও কণ্ঠ বায়ুরুদ্ধ হচ্ছিল, সে সাথে মনে অনুভূত হচ্ছিল প্রচন্ড ক্রোধ। এরূপ অবস্থায় কবরের পাশে দাঁড়িয়ে যখন সবাই কাঁদছিলেন সামায়া যার হৃদয় প্রচন্ড কষ্টে মুষড়ে পড়ছিল তিনি কবর থেকে এক মুঠো মাটি নিয়ে মাথা ও সারা শরীরে মাখতে শুরু করলেন। কবরের মাটিকে বুকে চেপে ধরে বললেন, “হে আমীরুল মুমিনীন! আমার পক্ষ থেকে সালাম। আপনি সৌভাগ্যের সাথে জীবন যাপন করেছেন, সৌভাগ্যের সাথে মৃত্যুবরণ করেছেন। আপনার সম্পূর্ণ জীবন ছিল সাফল্যমন্ডিত, আল্লাহর ঘর কাবায় জন্মগ্রহণ করেছেন, আল্লাহর ঘর মসজিদেই শাহাদাত বরণ করেছেন। জীবনের শুরুও আল্লাহর ঘরে, জীবনের পরিসমাপ্তিও আল্লাহর ঘরে। হে আলী! আপনি কতটা মহৎ ছিলেন আর এ মানুষরা কতটা হীন।
যদি এ সম্প্রদায় আপনার কথা মতো চলত তবে আসমান ও তাদের পায়ের নীচে থেকে নেয়ামত বর্ষিত হতো। তারা আখেরাতে ও দুনিয়ার সাফল্য লাভ করত। কিন্তু আফসোস! এ জনগণ আপনার মর্যাদা বোঝেনি। আপনার অনুসরণ না করে বরং আপনাকে কষ্ট দিয়েছে, আপনার হৃদয়কে রক্তাক্ত করেছে। আপনাকে এ অবস্থায় কবরে পাঠিয়েছে।”###########