ইসলামের দৃষ্টিতে দরিদ্রতা ও মানবতা

  • Posted: 01/07/2018

লেখকঃ ইশমাম ইকবাল

গত পাঁচ বছর আগে যশোহর থেকে খুলনায় ট্রেনে করে বাড়ি ফিরছিলাম ঈদের ছুটিতে এমন সময় এক বয়স্কা ভিখারী কাছে এসে ভিক্ষা চাইতে লাগল। অদ্ভুতভাবে লক্ষ্য করলাম এই নিঃস্ব মহিলাটির মুখে ভাষা পর্যন্ত নেই শুধু আওয়াজ আসছে আঃ আঃ আঃ এবং দুই নয়নে চোখের জল বের হচ্ছে। এই ঘটনাটি আমার মনকে ক্ষতবিক্ষত করল। আমরা কি রকম সমাজে বাস করি? আমরা কি রকম মানুষ যে একটি নিঃস্ব মহিলার পাশে দাঁড়াই না?
অনেকে বলবেন আপনি কি আগে এরকম দৃশ্য দেখেন নি? তাদের উদ্দেশ্যে বলি হ্যাঁ বহু দেখেছি। বহু ভিখারীকে রাস্তাঘাটে পড়ে থাকতে দেখেছি আর সভ্য সমাজ তাদের পাশ কাটিয়ে যেতে দেখেছি। দেখেছি এক ভিখারীকে নিজের ভাগের রুটির একটি অংশ পাশের কুকুরটিকে নিঃশঙ্কচে দিতে, আর আমরা সভ্য মানুষরা এইসব মানুষকে দেখে নাকে রুমাল চাপা দিয়ে চলে যেতে দেখেছি।
এইসব তথাকথিত সভ্য মানুষরা ভিখারীকে একটি পয়সাও না দিয়ে বলে যায় দেশটা ভিখারীতে ভরে গেল। এগুলোও দেখেছি, দেখেছি আর যন্ত্রণায় ছটফট করেছি ও সাধ্যমত চেষ্টা করেছি। কিন্তু আমার সামর্থ খুবই অল্প তাই নিরব দর্শক হয়েই থেকেছি। আসলে আমাদের সমাজ বহু ভাগে বিভক্ত তার মধ্যে যে দুটি ভাগ সবচেয়ে প্রবল একভাগের প্রচুর আছে যার শেষ নেই, অন্যদিকে নিঃস্ব, নিরন্ন, বুভুক্ষ মানুষ এদের কিছুই নেই।
আমাদের সমাজ এদেরকে ধনী ও দরিদ্র নামে ডাকে। আবার অনেকে বলে শোষক ও শোষিত। মালিক ও শ্রমিক নামেও এদের অভিহিত করা হয়। আসলে যুগ যুগ ধরে সবলরা দুর্বলের উপর, ধনীরা দরিদ্রদের উপর অত্যাচার করছে। এই আর্থিকভাবে সমৃদ্ধশালীরা আমার দরিদ্রদের ঘৃণার চোখে দেখে। তাদের দুঃখ, দুর্দশার প্রতি কোন সমবেদনা নেই। আসলে এরাতো মানুষের মত দেখতে কিন্তু মানুষ নয়? মানুষ হিসেবে কি আমাদের কোন কর্তব্য নেই? পশুরাও তো নিজে খায়, নিজে বাঁচে, নিজের সন্তান প্রতিপালন করে। তাহলে সভ্য মানুষের ও পশুর মধ্যে চিন্তা চেতনার পার্থক্য কোথায়? তাহলে কি করে আমরা দাবি করি মানুষ আশরাফুল মাকলুকাত বা জগৎ এর শ্রেষ্ঠ প্রাণী?
আবার দেখা যায় আর্থিক দিক থেকে সমৃদ্ধরা দরিদ্র শ্রেণীকে সৎপথে উপার্জনেও বাধার সৃষ্টি করে। যেমন, ট্রেনে, বাসে হকার উঠলে এলিট শ্রেণী বিরক্ত হয় তারা মন্তব্য করে এদের জ্বালায় ট্রেনে, বাসে ওঠায় দায়। এই শ্রেণী খুলনায় বিখ্যাত শপিং মলে গিয়ে কাপড় কেনে হাজার হাজার টাকা দিয়ে, কিন্তু পাশের বাড়ীর মানুষেরা কি কাপড় পড়ে আছে তাদের লজ্জা নিবরণ করতে পারচ্ছে কিনা সেদিকে বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই। আর এরা দামি দামি রেস্তোরায় বিদেশী খাবার অথবা চুকনগরের চুইঝাল দিয়ে খাশীর মাংস পেট ভরে খাই কিন্তু রাস্তায় ক্ষুধার জ্বালায় কাতর শিশুটি শুয়ে আছে তাকে একমুঠো ভাত দেওয়া হচ্ছে না। গৃহভৃত্য কোন কারণে যদি কাজ একটু কম করে তাদের বেতন কেটে নেওয়া হয়। এরা কুকুরকে খেতে দেয় যতœসহকারে কিন্তু মানুষকে খেতে দেয় না। এরা আবার সমাজের গণ্যমান্য ব্যক্তি!!!
অনেকে বলবেন আমার টাকা আমি কিভাবে খরচ করব আপনার অত মাথা ব্যাথা কিসের? ঠিক আমি আপনার সঙ্গে একমত পোষণ করি। আমার সেই অধিকার নেই। আসলে আমাদের মধ্যে মনুষত্ববোধ আছে এটাই অন্য প্রাণীর থেকে আমাদের আলাদা করে। নিশ্চয় আপনি খরচ করেন, কিন্তু আপনার অর্থের সামান্য পেলে একটা ভিখারীর জীবন ভাল হবে। পাঁচটি রুটির মধ্যে একটি আপনি কম খেলে আপনার কোন ক্ষতি হবে না, কিন্তু একটা না খেতে পাওয়া মানুষ বাঁচবে। আপনি যে অর্থের কাপড় মল থেকে কেনন তার সামান্য কিছু অংশ আপনার পাড়া প্রতিবেশীদেরকে দান করলে তাদের লজ্জা নিবরণ হবে। একটা পরিবার রক্ষা পাবে। এটা কি কম মানবিক কাজ নয়?
প্রতি বছর ঈদে যে কোটি কোটি টাকার অপচয় হয় পশু জবাই এর নামে বা পূজার প্যান্ডেলের জন্য যে টাকা খরচ হয় তার সামান্যতম অংশ দরিদ্রদের জন্য খরচ করলে কি সমাজ আরও সুন্দর হত না? পাকিস্তান কিম্বা ভারতে যে মানুষ অর্থের অভাবে চিকিৎসার যন্ত্রণায় ছটফট করছে তার সঙ্গে বাংলাদেশের বিনা চিকিৎসার যন্ত্রণায় মারা যাওয়অ মানুষটির কষ্ট কি আলাদা? আমার একার সামর্থ নেই এই সমাজের জন্য এই নিঃস্বদের জন্য কিছু করার কিন্তু আমাদের সামর্থ আছে। আমাদের ছোট ছোট প্রয়াসেই সমাজের বড় বড় কাজ হবে। অনেকে বলবেন এর ফলে আমি কি পাব? তাদের উদ্দেশ্যে বলি নিরন্নকে অন্ন দিলে মানুষের যে ভালবাসা পাবেন তা মানুষ হিসেবে আপনার জীবনকে সার্থক করবে। জান্নাতে গিয়ে লাভ কি? সেই ছোটবেলায় বাংলা বইয়ে একটি কবিতা পড়েছি সেই কবিতাটি এখনো মনে পড়ে। কবির ভাষায় বলি, কোথায় স্বর্গ কোথায় নরক? কে বলে তা বহুদূর? মানুষেরি মাঝে স্বর্গ, নরক, মানুষেতে সুরাসুর। বরং এই সামাকেই জান্নাতের সুখে পরিণত করুন। আমরা কি পারি না এই নিরন্ন মানুষদের ক্ষুধার যন্ত্রণাকে কিছুটা লাঘব করতে? আমরা কি পারি না একটা শোষণমুক্ত সমাজ ও সুন্দর পৃথিবী গড়ে তুলতে?###

Share: