কবরের উপর সৌধ নির্মাণ এবং মাজার জিয়ারত

  • Posted: 06/07/2018

এই প্রসংগটির উপর খুবই সংক্ষিপ্ত আকারে একটি পর্যালোচনা

পৃথিবীর সমগ্র মুসলমান সম্প্রদায়ের সাথে বৃটিশ রাজার প্রত্যক্ষ তত্বাবধানে সৃষ্ট ওয়াহাবীদের বিরোধের অন্যতম বিষয় হল কবরের উপর গম্বুজ ও সৌধ নির্মাণ সম্পর্কিত।
ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে মুসলমানগন এই রীতিটি অনুসরন করে এসেছে এবং এ বিষয়টি জায়েজ ও মুস্তাহাব হওয়ার স্বপক্ষে পবিত্র কোরআন ও হাদিস হতে দলীল প্রমান উপস্থাপন করেছে।
উপরন্ত এ কর্মটি যৌক্তিক এবং তা বুদ্বিবৃত্তি সম্পন্ন ব্যক্তিদের অনুসৃত রীতির সাথে সামজ্ঞস্যশীল।
কিন্ত ইবনে তাইমিয়ার সময় হতে এই রীতির প্রচন্ড বিরোধীতা শুরু হয়।
সৌদী শাসকগনের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় সৃষ্ট ওয়াহাবী আলেমগনের ফতোয়ার প্রেক্ষিতে তারা সকল মাজার, কবরের উপর নির্মিত সৌধ ও গম্বুজ ধ্বংস কার্যে রত হয়।
মহানবীর (সাঃ) মাজার ব্যতীত সকল সৌধ তারা ধ্বংস করে।
মহানবীর (সাঃ) রওজা ধ্বংসের ইচ্ছা থাকা সত্বেও বিশ্বের মুসলমানদের প্রতিরোধের ভয়ে তারা তা এখনও করতে পারে নি।
পাঠক,
এই বিষয় ওয়াহাবীদের মূল ফতোয়া,
নবী রাসুল, পবিত্র ইমামগণ ও প্রকৃত ওলী আউলীয়াদের কবরের উপর নির্মিত সৌধ মূর্তির ন্যায় এবং তার সামনে নত হয়ে সম্মান প্রর্দশন মুশরিকদের মূর্তিপুজার ন্যায়। অতএব, যে সকল সৌধ নির্মিত হয়েছে তা সবই হারাম ও বিদআত।
কবরের উপর সৌধ নির্মাণ নিষিদ্ধ বিদআত যা কবরবাসীর প্রতি অতিমানবীয় বিশ্বাস ও তার প্রতি অতিরঞ্জিত সম্মান প্রদর্শনের মাধ্যমে হয়ে থাকে এবং তা মানুষকে শিরকের দিকে ধাবিত করে।
তাই মুসলমানদের দায়িত্বশীল নেতা অথবা তার প্রতিনিধির কবরের উপর নির্মিত এরূপ সৌধসমূহ মাটির সাথে মিশিয়ে দিয়ে শিরকের মূলোৎপাটন করতে হবে।
এ প্রসংগে বলে রাখি,
সৌধ নির্মাণ বা কবর পাকা করা হারাম ও বিদআত বললেও তাদের ধর্মীয় গুরু ইবনে তাইমিয়ার কবরটা ঠিকই কিন্ত মার্বেল পাথর দিয়ে পাকা করে রাখা হয়েছে।
কবরের উপর সৌধ নির্মাণ ও পবিত্র কোরআন :
কবরের উপর সৌধ নির্মাণ আল্লাহর নিদর্শন সমূহের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের সামিল।
"...যারা আল্লাহর নিদর্শন সমূহের সম্মান করে তা অন্তরের পরহেজগারীর প্রমাণস্বরূপ..."। সুরা : হজ্জ-৩২।
আল্লাহর নিদর্শন হল এমন কোন প্রতীক যা আল্লাহর দিক নিদের্শক।
যদি কেউ আল্লাহর সান্নিধ্য পেতে চায় তবে ঐ প্রতীকের মাধ্যমে তাতে পৌছাতে পারে। অবশ্য "আল্লাহর নিদর্শন" অর্থ যদি তার দ্বীনের নিদর্শন বুঝায় তবে আয়াতটির অর্থ হবে যদি কেউ আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ করতে চায় তবে তার দ্বীনের নিদর্শন সমূহের স্থান প্রদর্শনের মাধ্যমে তা অর্জন করতে হবে।
"...নিশ্চয়ই সাফা ও মারওয়া আল্লাহর নিদর্শন...."। সুরা : বাকারা-১৫৮।
এমনকি কোরবানীর উদ্দেশ্যে যে উটকে মিনায় নিয়ে যাওয়া হয় তাকেও আল্লাহর নিদর্শন বলা হয়েছে।
"...আমরা কোরবানীর হ্রষ্টপুষ্ট উষ্ট্রকে তোমাদের জন্য আল্লাহর নিদর্শন বানিয়েছি..."। সুরা : হজ্জ-৩৬।
"...আল্লাহ যে সব গৃহকে মর্যাদায় উন্নীত করার এবং সেগুলোতে তার নাম উচ্চারণ করার আদেশ দিয়েছেন, সেখানে সকাল ও সন্ধায় তার পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করে এমন লোকেরা যাদের ব্যবসা বানিজ্য ও ক্রয় বিক্রয় আল্লাহর স্মরণ থেকে, নামাজ প্রতিষ্ঠা করা থেকে এবং জাকাত প্রদান করা থেকে বিরত থাকে না...”। সুরা : নূর- ৩৬, ৩৭।
প্রথমত উপরে উল্লেখিত আয়াতে গৃহ বলতে শুধু মসজিদ বুঝানো হয় নি।
বরং আয়াতের উদ্দেশ্য মসজিদসহ যে কোন স্থান যেখানে আল্লাহর নাম স্মরন করা হয়, যেমন নবীগণ ও তাদের স্থলাভিষিক্ত পবিত্র প্রতিনিধিদের গৃহ।
যে সমস্ত গৃহে ফেরেশতাগণ। হরহামেশা যাতায়াত করতেন বা করেন।
এমনকি এ দাবিও সত্য যে, উপরিউক্ত আয়াতটিতে মসজিদ ভিন্ন অন্য গৃহে বা গৃহসমূহের কথা বলা হয়েছে।
“...যখন তাহারা তাহাদিগের কর্তব্য বিষয় নিজদিগের মধ্যে বিতর্ক করিতেছিল তখন অনেকে বলিল, “উহাদিগের উপর সৌধ নির্মাণ কর”। উহাদিগের প্রতিপালক উহাদিগের বিষয় ভাল জানেন। তাহাদিগের কর্তব্য বিষয় যাহাদিগের মত প্রবল হইল তাহারা বলিল " আমরা তো নিশ্চয়ই উহাদিগের উপরে মসজিদ নির্মাণ করিব...”। সুরা : কাহফ-২১।
উপরে উল্লেখিত আয়াতে এটা পরিস্কার যে, কবরের উপর সৌধ বা মসজিদ নির্মাণ যদি অবৈধ বা বিদআত হত তাহলে অবশ্যই আল্লাহ অন্য আয়াতে তা নিষেধ করতেন।
কিন্ত এর বিপক্ষে নেতিবাচক কোন আয়াত পবিত্র কোরআনে কোথাও নেই।
এ প্রসঙ্গে পবিত্র কোরআনের এই আয়াতটি যথেষ্ট প্রণিধানযোগ্য।
“...যদি তাহারা, যখন তাহারা নিজেরাই নিজেদের ক্ষতি করেছিল, তোমার কাছে আসত এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমার জন্য প্রার্থনা করত এবং রাসুল তাহাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করত, নিশ্চয়ই তাহারা আল্লাহকে পেত সর্বকোমল, সর্বমমতাময়...”। সুরা : নিসা- ৬৪।
উপরে উল্লেখিত আয়াতটি ব্যবহার করা হয়েছে। অর্থাৎ কেয়ামত পর্যন্ত জগতের যে কোন মুসলমান রাসুলের (সাঃ) মাজার জিয়ারতে যেয়ে রাসুলের (সাঃ) নিকট নিজের গুনাহের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে এবং রাসুল (সাঃ) যদি তাকে ক্ষমা করে দেন তাহলে আল্লাহ সেই বান্দাকে ক্ষমা করে দেবেন।
অতএব, পবিত্র কোরআনের দৃষ্টিতে নবী রাসুলগণ, পবিত্র ইমামগণ এবং প্রকৃত ওলী আউলিয়াগণের পবিত্র মাজার জিয়ারত সম্পূর্ন বৈধ ও হালাল একটি ইবাদত।
ইসলামের প্রথম যুগ এবং কিছু হাদিস :
ইসলামের আবির্ভাবের যুগ থেকেই মুসলমানদের মধ্যে কবরের উপর সৌধ নির্মানের প্রচলন ছিল এবং এ বিষয়টি কখনই সাহাবী, তাবেঈন, তাবে তাবেঈনগণের প্রতিবাদের মুখোমুখি হয় নি।
ইতিহাসের পরিক্রমায় একমাত্র ওয়াহাবী সম্প্রদায় এ রীতির বিরুদ্ধে মৌখিক ও ব্যবহারিক প্রতিবাদ শুরু করে।
যার চুড়ান্ত কার্যক্রম বর্তমানের ওঝওখ এর মাজার ধ্বংসের কার্যক্রম পৃথিবীবাসী প্রত্যক্ষ করছে।
সহীহ আল বুখারীর বর্ণনায়,
আবদুর রহমান ইবনে আবি বাকরের মৃত্যুর পর হযরত আয়েশা নির্দেশ দিয়েছিলেন যে, তার কবরের উপর তাবু নির্মাণ এবং দেখাশোনার জন্য একজন ব্যক্তি নিয়োগের জন্য। সূত্র-সহীহ আল বুখারী ২য় খন্ড, পৃ-১১৯।
হযরত ওমর রাসুলের (সাঃ) স্ত্রী জয়নাব বিনতে জাহাশের কবরের উপর স্থাপনা নির্মাণের আদেশ দেন এবং কেউ এ কাজে বাধা বা ফতোয়া প্রদান করে নি। সূত্র-তাবাকাতে ইবনে সাদ, ৮ম খন্ড, পৃ-৮০।
সাইয়েদ বাকরী বলেন যে, কবরের উপর সৌধ নির্মাণের নিষেধাজ্ঞা হতে নবীগণ, শহীদ ও সৎকর্মশীল বান্দারা বহির্ভুত। সূত্র-ইয়ানাতুত তালেবীন, ২য় খন্ড, পৃ-১২০।
নবী রাসুলগণ, পবিত্র ইমামগণ এবং প্রকৃত ওলী আউলিয়াগণের পবিত্র মাজার জিয়ারত মানুষের আত্মার শান্তি এনে দেয় এবং মানুষকে খোদামুখী করে।
সারা পৃথিবীতে এ জাতীয় মাজারগুলিকে কেন্দ্র করে ইসলাম ও কোরআনের শিক্ষা প্রচারের শক্তিশালী ঘাটি গড়ে উঠেছে। তাছাড়া এই সমস্ত মাজারে প্রতিদিন লাখ লাখ ধর্মপ্রাণ লোক ইবাদত-বন্দেগীর মাধ্যমে নিজেদেরকে খোদামুখি করছে।
তারা নবী রাসুলগণ, পবিত্র ইমামগণ এবং প্রকৃত ওলী আউলিয়াগণের ওসিলা দিয়ে নিজেদের কৃত গুনাহের জন্য আল্লাহর দরবারে ক্ষমা প্রার্থনা করছে। অথচ ওহাবিরা মাজার জিয়ারতকে শিরক মনে করে।
কিন্ত তাদের এ ধারণা সম্পূর্ণ ভুল ও ভিত্তিহীন। কেননা নবী রাসুলগণ, পবিত্র ইমামগণ এবং প্রকৃত ওলী আউলিয়াগণ নিজেদের সুউচ্চ ঈমান ও তাকওয়ার মাধ্যমে আল্লাহর নিকট বিশেষ মর্যাদার অধিকারী, তাই সাধারণ লোকেরা তাদের মাজারে গমণ করে নিজেদের ভক্তি নিবেদন করে।
তিনি বলেন, নবী রাসুলগণ, পবিত্র ইমামগণ এবং প্রকৃত ওলী আউলিয়াগণের মাজার মানুষের মন ও আত্মার উপর ইতিবাচক প্রভাব ফেলার পাশাপাশি তাদেরকে খোদামুখী করে থাকে।
কবরের উপর সৌধ নির্মাণের বৈধতার বিষয় একদিকে বিশেষ দলীল রয়েছে যেমন সুন্নাত ও মুসলমানদের মধ্যে প্রচলিত রীতি অন্যদিকে সার্বজনীন বৈধতার দলিলও রয়েছে।
সুপ্রিয় পাঠক, এ বিষয় যতটা সম্ভব সংক্ষিপ্ত আকারে মূল বিষয়গুলো তুলে ধরার চেষ্টা করেছি।

বিস্তারিত জানতে হলে দয়া করে অতি সত্বর "ওয়াহাবীদের সৃষ্ট সংশয়ের অপনোদণ" বইটি সংগ্রহ করে পড়ুন।
সুত্রঃ ওয়াহাবীদের সৃষ্ট সংশয়ের অপনোদন,
মূল লেখকঃ আলী আসগর রেজওয়ানী,
বাংলা অনুবাদঃ আবুল কাসেম###

Share: