মোঃ কবির হোসেন
পবিত্র ইসলাম ধর্মে জনগণের অধিকার সুরক্ষার প্রতি অত্যন্ত জোরালো তাগিদ দেয়া হয়েছে। পবিত্র ঐশ্বি কিতাব আল কুরআন ও আহলে বাইত (আ.) গণের বাণীতে হাক্কুন নাস বা মানবাধিকারের প্রতি বিশেষ দৃষ্টি দেয়া হয়েছে। এই বিশ্ব চরাচরে মহান নবী রাসুল (সা.) গণ আবির্ভাবের ও প্রেরণের মূল উদ্দেশ্যের মধ্যে একটি লক্ষ্য ছিল জনগণের অধিকার সুপ্রতিষ্ঠিত করা।
মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের পবিত্র গুণাবলীর একটি গুণাবলী হলো, তিনি ন্যায়বিচারক। আর আল্লাহর সুবিচারকের সাথে মানবাধিকারের বিষয়টি ওতপ্রোতভাবে জড়িত। যেহেতু হাক্কুন নাসের মত তাৎপর্যপূর্ণ বিষয়টি কখনো ছোট করে দেখার কোন উপায় নেই। পবিত্র ইসলাম ধর্মে বান্দা ও প্রভুর হক দুটিকে পুঙ্খানুপুঙ্খানুভাবে মেনে চলা ও রক্ষা করার জন্যে আহবান জানানো হয়েছে। কেননা, হয়তো কাল প্রয়াণ দিবসে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন স্বীয় অনাদায়কৃত অধিকার আদায় না হবার জন্য ক্ষমা করে দিবেন; কিন্তু বান্দার হক আদায় না হবার কারণে জিজ্ঞাসা করবেন। আর সেই মহা প্রলয়ের দিন বান্দারা মহা বিপদের মাঝে পতিত হবে। যদিও উল্লখ্য যে, বান্দা ও প্রভুর হক দুটিই আদায় করতে হবে। যেহেতু সৃষ্টিকর্তা ছাড়া কোন আধিকার কারোরি নেই, তিনি মহাপরাক্রমশালী ও সমস্ত কিছুর স্বত্ত্বাধিকারী। আর তাঁর নির্দেশই হলো বান্দার হকসমূহের পদাঙ্কনুসরণ করে চলা।
পবিত্র কুরআন এ প্রসঙ্গে বলে, আমি আমার রসূলগণের সুস্পষ্ট নিদর্শনসহ প্রেরণ করেছি এবং তাঁদের সাথে অবতীর্ণ করেছি কিতাব ও ন্যায়নীতি যাতে মানুষ ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করে। (সূরা হাদীদ আয়াত-২৫)
উক্ত আয়াতের তাৎপর্য এটাই যে ধর্মের মূল লক্ষ্যের মধ্যে একটি হচ্ছে মানবাধিকার রক্ষার প্রতি ইঙ্গিত। পবিত্র আল কুরআন ও হাদীসের বাণীতে মোমিন বান্দাদেরকে সামাজিক রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক প্রতিটি ক্ষেত্রে মানুষের অধিকার আদায় করা ও সুরক্ষা করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। নমুনাস্বরূপ পবিত্র ঐশ্বি কিতাব কুরআনের আরো দুটি আয়াত উপস্থাপন করতে পারি।
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন : হে ঈমানদরগণ! তোমরা একে অপরের সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস করো না। (সুরা নিসা, আয়াত : ২৯)
অন্যের মালের উপর হস্তক্ষেপ এখানে সম্পূর্ণভাবে নিষেধ করা হয়েছে। পবিত্র কুরআন অন্যত্র ইহুদী গোত্রের অশ্লীল কর্মকান্ডের প্রতি ভৎসনা জানিয়ে বলেন, “আর এ কারণে যে তারা সুদ গ্রহণ করত, অথচ এ ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছিল এবং এ কারণে যে তারা অপরের সম্পদ ভোগ করতো অন্যায়ভাবে। বস্তুতঃ আমি কাফেরদের জন্য তৈরি করে রেখেছি বেদনা দায়ক আযাব।” (সুরা নিসা, আয়াত ১৬১)
পবিত্র হাদীসের বাণীতেও মানবাধিকারের প্রতি বিশেষভাবে তাকিদ দেয়া হয়েছে। আমীরুল মোমিনীন হযরত আলী (আ.) বলেন, “যে জুলুমের ক্ষমা নেই; যেটা হলো এক বান্দার প্রতি আরেক বান্দার কৃত জুলুম।” (নাহজুল বালাঘা-খুতবা ১৭৫)
অন্যত্র ইমাম আলী (আ.) বলেন, “মহান সৃষ্টিকর্তা বান্দার হক আদায়কে নিজের হকের উপর প্রাধান্য দিয়েছেন। আর বান্দার হক আদায় যে করবে সে দয়াময়ের হকের অনুগামী হবে।” (মিজানুল হিকমা, খঃ ২, পৃঃ ৪৮০)
পবিত্র আয়াত ও রেওয়ায়েতের ভিত্তিতে একজন মুসলিমের অপর মুসলিম ভাইয়ের প্রতি অনেকগুলি অধিকার রয়েছে। তন্মধ্যে কয়েকটি উল্লেখযোগ্য।
১। জনগণের সহায় সম্পত্তি রক্ষা করাঃ
পবিত্র ইসলাম ধর্মে মুসলমানদের স্বয় সম্পত্তির প্রতি সম্মান জানাতে আহ্বান জানানো হয়েছে। আর কারো সম্পদ লুট করার অধিকার কারো নেই। যদিওবা কেউ সুদখোরি, লুটতরাজি, ঘুষখোরি বা ফাঁকিবাজির মাধ্যমে অপরের সম্পদ ভক্ষণ করে থাকে, তার উচিত সম্পদের মহাজনকে তা বুঝিয়ে দেয়া। অথবা মালিককে যেভাবেই হোক রাজি, খুশি করানো এবং ক্ষমা প্রার্থনা করা।
২। জনতার জান প্রাণের হেফাজত করাঃ
মুসলমানের জান অত্যন্ত সম্মানিত। পবিত্র ইসলাম ধর্ম মোমিনদের প্রাণের প্রতি বিশেষ ইজ্জত দান করেছেন। অতএব, কাউকে আঘাত করা, দুষিত খাদ্য পরিবেশন করা, খাদ্য দ্রব্যাদীতে বিষাক্ত রাসায়নিক কোন কিছু ব্যবহার করা, ড্রাগস ব্যবহারে উৎসাহিত করা ইত্যাদি ইত্যাদি সকল প্রকার বিষয়াবলী যা জনসাধারণের সুস্থ্যতার ব্যাঘাত ঘটায় প্রত্যেকটি মানবাধিকার হরণ করার শামিল। সুতরাং মানুষের জান প্রাণের প্রতি সম্মান না জানিয়ে পৃষ্ঠপ্রদর্শন বা তাদের শারীরিক ব্যাধির পরিবেশ সৃষ্টি করাকে আল্লাহপাক কখনো পছন্দ করেন না। ইমাম আলী (আ.) এ প্রসঙ্গে বলেন, “দয়াময় আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন আমার ইজ্জতের শপথ! বিন্দুমাত্র জুলুমকে ছাড় দেয়া হবে না। সেটা যদি এক হাত অপর হাতের উপর মারার পরিমাণও হয় অথবা অন্যায়ভাবে অপরের প্রতি হাত ও প্রয়োগ করা হয়।” (সূত্র ঃ বিহারুল আনোয়ার, খঃ ৬, পৃঃ ২৯)
এতদ্ব্যতীত কোন মানুষের অধিকার নেই সে অপরকে দুঃখ কষ্ট দিবে, হুমকি ধমকির পন্থায় আতঙ্কে রাখবে। এমন অপরাধ যদি কারোরি জীবনে ঘটে থাকে তাহলে মাজলুম ব্যক্তিটির কাছে ক্ষমা চাওয়া ছাড়া উপায়ন্তর নেই। নচেৎ কঠিন শাস্তির জন্য তৈরি থাকতে হবে।
৩। অপর ব্যক্তির মান-সম্মানের প্রতি সতর্ক থাকাঃ
অন্যদের মান-সম্মান, ইজ্জত, আব্রু রক্ষা করে চলাও মানবাধিকারের একটি বিষয়। যদি কেউ গীবত, পরনিন্দা, অশ্লীল কথা-বার্তা, আচার-ব্যবহারের মাধ্যমে অপর মুসলমানের সম্ভ্রমকে ভুলন্ঠিত করে নিজেকে অপরাধী ভেবে তার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করা উচিত।
ইমাম মোহাম্মদ জাফর সাদিক (আ.) বলেন “তোমার মোমিন ভ্রাতার উপর সর্বাপেক্ষা ছোট বা ন্যূনতম অধিকারের মধ্যে একটি হলো নীজের জন্য যা প্রিয় অপরের জন্যও তাই হওয়া উচিত এবং যা তোমার অপ্রিয় অন্যের জন্য তাই মনে করো। (সূত্র : বিহারুল আনোয়ার, খন্ড-৭৪, পৃষ্ঠা-২২৪)।######