ইমাম হোসাইন (আঃ) ও তাঁর দর্শন

  • Posted: 10/09/2018

প্রথম ইমাম হযরত আমিরুল মুমিনিন আলী (আঃ) ও “নারী জাতির চিরন্তন আর্দশ”, “নারীকূলের শিরোমনি” হযরত ফাতিমা যাহরা (আঃ) এর দ্বিতীয় পুত্র নবী বংশের যোগ্য উত্তরসূরী, নবীবংশের বারো ইমামতি ধারার তৃতীয় ইমাম হযরত ইমাম হোসাইন (আঃ) ৪র্থ হিজরী সনের ৩রা শাবান মাসের বৃহস্পতিবার মদিনাতে জন্মগ্রহণ করেন। ইমাম হোসাইন (আঃ) এর জন্মের সংবাদ পেয়ে রাসুল (সাঃ) হযরত আলী (আঃ) এবং ফাতিমা (আঃ) এর গৃহে আগমন করেন। তিনি শিশুকে তাঁর কাছে আনার জন্য বলেন। সাদা কাপড়ে পেঁচিয়ে সদ্যপ্রসূত শিশুকে রাসুল (সাঃ) এর খেদমতে আনা হলে তিনি শিশুর ডান কানে আযান আর বাম কানে ইক্বামত পাঠ করেন। তাঁর সৌভাগ্যময় জন্মের প্রথম অথবা সপ্তম দিনে হযরত জিবরাইল (আঃ) অবতীর্ণ হয়ে বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসুল, আল্লাহর সালাম আপনার জন্যে প্রেরিত হোক। আপনি এই নবজাত শিশুর জন্যে হযরত হারুনের কনিষ্ঠ পুত্রের নামে ‘শুবাইর‘ যা আরবীতে ‘হোসাইন‘ বলা হয় সেই নামকরণ করুন। কেননা, আলী আপনার জন্যে হযরত মুসার নিকট হারুনের ন্যায়, পার্থক্য শুধু এটাই যে আপনি আল্লাহর শেষ নবী।” এভাবে এই মহীমাময় নাম ‘হোসাইন‘ আল্লাহর পক্ষ থেকে রাখা হয়। তাঁর জন্মের সপ্তম দিবসে হযরত ফাতিমা (আঃ) আক্বিকা হিসাবে একটি দুম্বা ইমাম হোসাইনের জন্যে কোরবানী করেন এবং তাঁর নবজাত শিশুর মাথা মুন্ড করেন আর সেই কর্তিত চুলের সম ওজনের রুপা আল্লাহর পথে দান করেন।
রাসুল (সাঃ) এর ইন্তেকালের সময় ইমাম হোসাইন (আঃ) এর বয়স ছিল ছয় বছর। এই ছয় বৎসর বয়সে ইমাম হোসাইনের প্রতি রাসুলের (সাঃ) দয়া ও ভালবাসা প্রত্যক্ষ করে তাঁর উচ্চ মর্যাদা ও মহত্ব লক্ষ্য করেছেন সকলে। হযরত সালমান ফারসী (রাঃ) বলেন, আমি দেখেছি, রাসুল (সাঃ) হোসাইনকে তাঁর হাটুর উপর বসিয়ে চুমু খাচ্ছেন আর তখন তিনি বলছেন, “তুমি মহান, মহান ব্যক্তির পুত্র এবং মহান ব্যক্তিবর্গের পিতা। তুমি ইমাম, ইমামের পুত্র, ইমামের ভাই এবং ইমামদের পিতা। তুমি আল্লাহর হুজ্জাত, আল্লাহর হুজ্জাতের পুত্র এবং আল্লাহর নয়জন হুজ্জাতের পিতা। তাদের শেষ জন শেষ যামানায় ক্বিয়াম করবেন।” ( কামাল আল দ্বীন- সাদুক, ১৫২পৃষ্ঠা), রাসুল (সাঃ) আরো বলেন, “হোসাইন আমার থেকে এবং আমি হোসাইন থেকে” (সুনানে তিরমিযি- ১১খন্ড, ৩২৪পৃষ্ঠা) ।
ইমাম হোসাইন (আঃ)-এর কুনিয়াহ বা ডাক নাম হচ্ছে, আবু আব্দুল্লাহ আর লাক্বাব বা পদবী হচ্ছে, সাইয়্যেদুশ শুহাদা। তাঁর জন্মের কালে শাসকের নাম ছিল সম্রাট ইয়াজ-দ-গার্দ। বিশ বছর ইরানের সিংহাসনের অধিকারী সাসানীয় শেষ সম্রাট ইয়াযদগার্দের কন্যা রাজকুমারী শাহ-রে-বানু ছিলেন ইমাম হোসাইন (আঃ) এর স্ত্রী, যিনি যুদ্ধে বন্দী হয়ে ছিলেন। এই রাজকুমারী পরে ইসলাম গ্রহণের পর তাঁর ইচ্ছা অনুসারে হযরত ইমাম হোসাইন (আঃ) এর সাথে বিবাহ সূত্রে আবদ্ধ হয়েছিলেন। এই মহিয়ষী নারীর গর্ভে চতুর্থ ইমাম জয়নুল (আঃ) জন্মগ্রহণ করেন। যাঁর মূল নাম ছিল আলী, যিনি ছিলেন কারবালার হৃদয়বিদারক ঘটনার অন্যতম সাক্ষী। তখন তাঁর বয়স ছিল মাত্র বাইশ বছর। পরবর্তীতে আধ্যাত্মিকতার সাধনায় চরম পরাকাষ্ঠা লাভ করে “যয়নুল আবেদীন” বা সাধকদের সৌন্দর্য উপাধিতে আখ্যায়িত হয়েছিলেন। ইমাম হোসাইন ৬১ হিজরী সনে ১০ই মুহররম শুক্রবার ৫৭ বছর বয়সে কারবালার যুদ্ধে শাহাদাতবরণ করেন। কারবালার প্রান্তরে তাঁকে দাফন করা হয়। রাসুল (সাঃ) এর আবির্ভাবের পূর্ব পর্যন্ত মানব ইতিহাসের অধিকাংশ বড় বড় যুগান্তকারী ঘটনা ১০ই মুহররম তথা আশুরার দিনে সংঘটিত হয়। রাসুল (সাঃ) এর ইন্তেকালের মাত্র ৫০ বছরের মধ্যে উমাইয়া শাসক ইয়াজিদের চক্রান্তে তাঁর প্রিয় দৌহিত্র হযরত ইমাম হোসাইন (আঃ)কে শহীদ করা হয় অত্যন্ত নির্মম ও নৃশংসভাবে।
পৃথিবীর প্রথম মানব হযরত আদম (আঃ) এর উপর আল্লাহ পাক ইসলাম বা তাঁর নিকট আত্মসমর্পণ করে জীবন পরিচালনার যে দায়িত্ব অর্পণ করেছিলেন তা ক্রমবিকাশের ধারায় শেষ ও শ্রেষ্ঠ রাসুল হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর মাধ্যমে একটি পূর্ণাঙ্গ জীবন বিধান এবং অনুকরণীয় সরল পথ হিসাবে আল্লাহকর্তৃক মনোনীত হয়েছে। আল্লাহর নিকট আত্মসমর্পণকারী ব্যক্তি প্রবৃত্তির দাস না হয়ে যদি আল্লাহর কাক্সিক্ষত পথে চলার জন্য নিজেকে অনুগত করে ফেলে ও সে মোতাবেক অকুতোভয়ে তাগুতী শক্তিতে পরাভূত করার জন্য সদা প্রস্তুত থাকে তবে সে নবী-রাসুলদের জীবনধারা থেকে চলার দিশা পেতে পারে। ইমাম হোসাইন (আঃ) এর ধমনীতে মহানবী (সাঃ) ও বীর সিংহ ইমাম আলী (আঃ) এর রক্ত প্রবহমান তাই তিনি কোনক্রমেই অন্যায়ের নিকট মাথা নত করতে পারেন না। তিনি জীবন কুরবানির শিক্ষায় উদ্দীপ্ত হয়ে অন্যায়ের বিরুদ্ধে জিহাদের জন্য প্রস্তুত হয়ে যান। পার্থিব জীবন তাঁর কাম্য নয়, খোদার দ্বীন প্রতিষ্ঠা তাঁর জীবনের প্রধান ব্রত ও লক্ষ্য হয়ে যায়। মুহররম মাসের ২রা তারিখে পরিবার পরিজন ও অনুসারীসহ ৭২জন ব্যক্তি নিয়ে ফোরাত নদীর পশ্চিম তীরে কারবালা নামক শুষ্ক প্রান্তরে উপনীত হন। কাপুরুষ উমাইয়া সৈন্যরা মুহররম মাসের পবিত্রতার সব রীতি ভঙ্গ করে সম্মুখ যুদ্ধে না এসে দূর থেকে তীর নিক্ষেপ করতে থাকে এবং ফোরাত নদীর পানি তাদের জন্য বন্ধ করে দেওয়া হয়। শিশু ও মহিলাদের জন্য তারা কোনরূপ অনুকম্পা প্রদর্শন করে নি। মাসুম বাচ্চারা এবং নিরপরাধ মহিলারাও স্বৈরাচারী ইয়াযিদী যুলুম হতে রক্ষা পায়নি। একে একে তারা দুর হতে তীর নিক্ষেপ করে ইমাম হোসাইনের পরিবার-পরিজন ও লোকদেরকে শহীদ করতে থাকে। শেয পর্যন্ত ইমাম হোসাইন (আঃ) সিংহের হুঙ্কার ছেড়ে উমাইয়াদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়েন এবং শক্রপক্ষের অনেক সৈন্যকে হত্যা করে মুহররম মাসের ১০ তারিখে প্রতিপক্ষের তীরের আঘাতে জর্জরিত হয়ে শাহাদাতবরণ করেন।
পাপিষ্ঠ ও ঘৃণিত শিমার ইমাম (আঃ) এর দেহ থেকে ‘মস্তক মোবারক’ বিচ্ছিন্ন করে কুফার শাসনকর্তা উবায়দুল্লাহ ইবনে যিয়াদের নিকট উপস্থাপন করে এবং এই পাষন্ড শাসক উবায়দুল্লাহ ইবনে যিয়াদ ইমাম (আঃ) এর ‘মস্তক মোবারক‘ বেত দিয়ে আঘাত করায় দরবারে উপস্থিত এক বৃদ্ধ সাহাবী বলে উঠেছিলেন, “হায় আফসোস! আমি স্বচক্ষে এই পুণ্যাত্মার গলায় মহানবীকে চুম্বন করতে দেখেছি।” আর বাংলার প্রান্তর থেকে কবি নজরুল ইসলাম বলে উঠলেন, “নীল সিয়া আসমান, লালে লাল দুনিয়া, ‘আম্মা! লাল তেরি খুন কিয়া খুনিয়া। ‘কাঁদে কোন ক্রন্দসী কারবালা ফোরাতে, সে কাঁদনে আসু আনে সীমারেরও ছোরাতে।”
উল্লেখ্য যে, উবায়দুল্লাহ ইবনে যিয়াদ ছিলেন যিয়াদ ইবনে আবু সুফিয়ানে পুত্র। যিয়াদের মৃত্যুর পর উবায়দুল্লাহ ইবনে যিয়াদ ইরাকের শাসনকর্তা নিযুক্ত হন। তার পিতা যিয়াদ ছিল ‘জারজ সন্তান’। মুয়াবিয়ার পিতা আবু সুফিয়ানের এক বাঁদীর গর্ভে যিয়াদের জন্ম হয়। পরবর্তীতে আবু সুফিয়ান তাকে নিজ ঔরসের জন্ম বলে ঘোষনা করেন কিন্তু মুয়াবিয়া তাকে ভাই বলে স্বীকার করতেন না। পরবর্তীতে রাজনৈতিক কারনে তার শাসন আমলে এক পত্রের মাধ্যমে তাকে ভাই বলে স্বীকার করেন এবং তার সহযোগী করেন।
আল-কুরআনে বলা হয়েছে, “তোমাদের মধ্যে এমন একটি দল থাকা চাই যারা কল্যাণের পথে ডাকবে এবং সৎ কাজের আদেশ দেবে, অন্যায় ও গর্হিত কাজ থেকে নিষেধ করবে, তারাইতো সফলকাম” (সূরা আল-ইমরান ঃ ১০৪), তাই আমরা দেখি, ‘আমর বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার’ অর্থাৎ, সৎ কাজের আদেশ দান ও অন্যায়ের প্রতিরোধ-এর মধ্যেই কারবালার শাহাদাতের রহস্য ও ইমাম হোসাইন (আঃ) এর দর্শন নিহিত রয়েছে। আল-কুরআনের ঘোষণা ছিল “আল্লাহর দাসত্ব স্বীকার করো, তাগুত পরিহার করো” আর যেখানে তাগুত (সীমালংঘনকারী, স্বেচ্ছাচারী, খোদাদ্রোহী) ক্ষমতার মসনদে বসেছে তাদের বিরুদ্ধে গণঅভ্যুথান গড়ে তোলা, সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়া নবী-রাসূলগণের অন্যতম দায়িত্ব ছিল। আল-কুরআনের বিভিন্ন পর্যায়ে এই তাগুতের বিরুদ্ধে আপোষহীন সংগ্রামের কথা চল্লিশবার উল্লেখ রয়েছে। হযরত হাবিল (আঃ) থেকে শুরু করে কুরআনে বর্ণিত জুলুম নির্যাতন এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে তাগুতী শক্তির উপর আপতিত শাস্তির দীর্ঘ ইতিহাস পর্যালোচনা করলে খুব সহজেই বোঝা যায় যে, যেখানেই স্বৈরাচারীগণ তাদের জুলুম-নির্যাতন চালিয়েছে, নিজেকে আল্লাহর আসনে বসিয়ে নিরংকুশ ক্ষমতার মালিক বলে ঘোষণা দিয়েছে, আল্লাহর দেয়া সম্পদ-যাতে সাধারণ মানুষের অধিকার রয়েছে সেই সম্পদকে কুক্ষিগত করে নিজেদের সম্পদ মনে করে খেয়ালখুশীমত ভোগ করার অপপ্রয়াস চালিয়েছে, সেখানেই নবী-রাসুলগণ তাদের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক জিহাদে অবতীর্ণ হয়েছেন, নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, নির্বাসিত হয়েছেন এবং শাহাদাতবরণও করেছেন। নবুয়্যতের ধারার পরিসমাপ্তির পর সর্বাগ্রে এ দায়িত্ব নবীজীর বংশধরগণের উপর অর্পিত হয়। কুরআনের শিক্ষায় নবী-রাসুল ও তাদের ওয়ারিশগণের অন্যতম দায়িত্ব হলো ‘আমরে বিল মারুফ ওয়া-নাহি আনিল মুনকার’ অর্থাৎ “সৎ কাজের আদেশ দান ও অন্যায় কাজে নিষেধ করা” কিন্তু যারা জাতির কান্ডারী ও পথনির্দেশক তারা যদি দৃঢ় সিদ্ধান্ত না দিয়ে ছাড় দেয়ার নীতি অবলন্বন করেন তখনই জাতি ধ্বংস হতে বাধ্য। তাইতো তিনি পিতা ইমাম আলী (আঃ) এর সহিত জামাল, সিফফিন এবং নাহরেওয়ানের যুদ্ধগুলোতে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেছিলেন। ইয়াজিদের সময় যদিও বহু সাহাবী, তাবেয়ী এবং আল্লাহর দ্বীনের সমঝদার অনেক লোক বিদ্যমান ছিলেন কিন্তু নির্যাতন ও প্রাণের ভয়ে কোন কোন ক্ষেত্রে আপোষমূলক ইজতিহাদের ফলে বেশীর ভাগ লোকের কন্ঠ স্তদ্ধ ছিল। কিন্তু শহীদানের নেতা ইমাম হোসাইন (আঃ) ছাড় দেওয়ার নীতিকে দ্বীন ও ঈমানের জন্য ভয়াবহ বিপদ মনে করে দৃঢ় প্রত্যয়ের সাথে কঠিন বিপদের ঝুঁকিপূর্ণ পথ গ্রহণ করেন। তাই ইমাম হোসাইন (আঃ) ভালোভাবেই উপলদ্ধি করতে পেরেছিলেন, যদি ইয়াজিদের এই স্বৈরাচারী ব্যবস্থাকে মেনে নেয়া হয় তাহলে মহানবী (সাঃ) এর উপস্থাপিত ইসলাম বিকৃত ও বিলুপ্ত হতে বাধ্য। তিনি এক জ্বালাময়ী ভাষণে বলেছিলেন, হে লোক সকল! রাসুল (সাঃ) বলেছেন, “যে ব্যক্তি এমন অত্যাচারী শাসককে দেখবে যে আল্লাহর হারামকে হালাল করেছে, আল্লাহর সাথে কৃত প্রতিশ্র“তি ভঙ্গ করেছে, রাসুলের সুন্নাতের খেলাফ করেছে, আল্লাহর বান্দাদের সাথে গুনাহ ও শক্রতাপূর্ণ কাজ করেছে, কাজ ও কথার দ্বারা কেউ যদি তা প্রতিহত করার না থাকে তখনই আল্লাহতা’য়ালা যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করেন।” তিনি আরো বলেন, সাবধান! ওরা (ইয়াজিদ গোষ্ঠী) শয়তানের আনুগত্য করছে, পরম করুণাময়ের হক বা সীমালঙ্ঘন করছে, বিনা পরিশ্রমে সম্পদ ভোগে মেতে উঠেছে, আল্লাহ যা হারাম করেছেন তারা তা হালাল করেছে, আর যা হালাল তাকে হারাম করেছে, এ ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ উল্টিয়ে দিতে আমিই সবচেয়ে বেশী অধিকার রাখি।” (তারিখে তাবারী, খঃ ২য়, পৃঃ ৩০৭) জীবনের শেষ রক্ত বিন্দু দিয়ে ইমাম হোসাইন (আঃ) যদি সেদিন ‘আমর বিল মারুফ এবং নাহী আনিল মুনকারের দায়িত্ব পালন না করতেন, তাহলে সৎ কাজের আদেশ দান এবং অন্যায়ের প্রতিকারের বাস্তবতা বিলীন হয়ে যেত। ক্ষমতালোভী এবং স্বার্থপর শাসকরা ও দরবারী আলেমরা নিষেধকে আদেশ হিসাবে চালিয়ে দিত। নমরুদের বিরুদ্ধে হযরত ইবরাহীম (আঃ) এবং ফিরাউনের বিরুদ্ধে হযরত মুসা (আঃ) সংঘটিত সংগ্রামসমূহ যে সব কারণে হয়েছিল ইয়াজিদের বিরুদ্ধে ইমাম হোসাইন (আঃ) এর সংগ্রাম সেই একই ধারায় সংঘটিত হয়েছে। পবিত্র আল-কুরআনের বিভিন্ন পর্যায়ে ৩১৬ বার জুলুম ও জালেম সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। ইয়াজিদের জুলুমের বিরুদ্ধে ইমাম হোসাইন (আঃ) ছিলেন সত্যের সাক্ষী। তাঁর শাহাদাত এর মাধ্যমে কিয়ামত পর্যন্ত হক ও বাতিলের পরিচয় সুনির্ধারিত হয়েছে। তাই আজ বিশ্বের যেখানেই ইসলামের জাগরণ ও বিপ্লবী আওয়াজ উঠেছে সেখানেই ইমাম হোসাইন (আঃ) এর তাজা খুন কথা বলেছে।
ইমাম হোসাইন (আঃ) ছিলেন আল্লাহর রাসূলের হাতে গড়া, মা ফাতিমা (আঃ) ও হযরত আলী (আঃ) এর সরাসরি তত্ত্বাবধানে লালিত। জ্ঞান, প্রজ্ঞা,তাকওয়া, রাজনৈতিক বিচক্ষণতা ও দূরদর্শিতা ছিল তাঁর মধ্যে। তাঁর সাতান্ন বছরের জীবনের প্রতি দৃষ্টি দিলে দেখতে পাই, তাঁর সারাটা জীবনের ধার্মিকতা, বন্দেগী ও রাসুল (সাঃ) এর রেসালাত জীবনের অনুসরণ। তিনি অনেকবার পায়ে হেঁটে কা’বা গৃহে ছুটে গেছেন এবং হজ্জ্বব্রত পালন করেছেন। তিনি দিবা রাত্রিতে কয়েক’শ রা’কাত নামাজ আদায় করতেন। এমনকি তাঁর জীবনের শেষ রাত্রিতেও কারবালাতে শক্রদের কাছ থেকে সময় ও সুযোগ চেয়েছেন যেন তাঁর মহান প্রভুর সাথে একাকী প্রার্থনা করতে পারেন।
অপরদিকে, ইয়াজিদের দাদা আবু সুফিয়ান প্রায় বিশ বছর যাবত মহানবী (সাঃ) এর বিরুদ্ধে সংগ্রামে লিপ্ত ছিলেন, এমনকি শেষের পাঁচ-ছয় বছর তিনি ইসলামের বিরুদ্ধে পরিচালিত সংগ্রামে নেতৃত্বও দেন। আবু সুফিয়ান এবং মুয়াবিয়া মক্কা বিজয় পর্যন্ত ইসলাম গ্রহন করেননি। ইয়াজিদের পিতা মুয়াবিয়া ইবনে আবু সুফিয়ান যার হাতে ইসলামের স্বর্গীয় কাঠামোর বিবর্তন, ভাঙ্গন ও পতন ঘটেছিল তিনিও এক সময় তার পিতা আবু সুফিয়ানের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ইসলামের বিরুদ্ধাচরণ করেছিলেন। আবু সুফিয়ানের স্ত্রী অর্থাৎ মুয়াবিয়ার মাতা হিন্দা ওহুদের যুদ্ধের সময় হামজা (রাঃ) এর কলিজা চিবিয়ে খেয়েছিল এবং অসংখ্য শহীদদের লাশ বিকৃত করতে তাতে অংশ নেয়। অথচ হামজা (রাঃ) হলেন রাসুল (সাঃ) এর চাচা। রাসুল (সাঃ) তাঁর জন্য গর্ববোধ করতেন এবং তিনি যখন ওহুদের যুদ্ধে শহীদ হলেন তখন রাসুল (সাঃ) তাঁর জন্য ক্রন্দন করেছিলেন এবং তাঁকে শহীদদের সরদার উপাধিতে ভূষিত করেছেন। এই আবু সুফিয়ানের দল তথা ‘উমাইয়া গোষ্ঠী’ ইসলামের শত্র“তে পরিণত হয়েছিল এবং মহানবী (সাঃ) এর ইন্তেকালের পর অর্ধশতাব্দী গত হতে না হতেই ইসলামের মধ্যে যে বিপর্যয় সৃষ্টি হয় তার জন্য উমাইয়ারাই ছিল কার্যতঃ বেশী দায়ী। রাসুল (সাঃ) মুয়াবিয়াকে লানত করেছেন। ইবনে আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সাঃ) তাকে মুয়াবিয়াকে ডাকতে পাঠালে তিনি দেখেন সে খানা খাচ্ছে, ফিরে আসলে পূনরায় রাসূল (সাঃ) তাকে ডাকতে পাঠালে তিনি দেখলেন সে খানা খাচ্ছে। রাসুল (সাঃ) এর ডাকে সে সাড়া না দেওয়ার জন্যে রাসুল (সাঃ) বল্ললেন, “ আল্লাহ যেন কখনোই তার উদর পূর্তি না করেন।” (সহীহ মুসলিম ৮খন্ড, ২৭পৃষ্ঠা), ইতিহাসবেত্তাগণ লিখেছেন যে, মুয়াবিয়ার উপর রাসুল (সাঃ) এর বদ-দোয়া কার্যকর হয়েছিল, আর সে কারণেই মুয়াবিয়া খেতে খেতে হাপিয়ে উঠতো তবুও তার পেট ভরতো না। অপর একটি হাদীস হচ্ছে, ইবনে আব্বাস হতে বর্ণিত হয়েছে, আমরা একদা রাসুল (সাঃ) এর সফর সঙ্গী ছিলাম। দু’জন লোককে গান করতে দেখা গেল, গানের মধ্যেই তারা একে অপরের কথায় জবাব দিচ্ছিল। নবী (সাঃ) বল্লেন, “দেখ তো এরা কারা”। লোকেরা বললো, “এরা হল মুয়াবিয়া এবং আমর ইবনুল আস”। তখন রাসুল (সাঃ) হাত উত্তোলন করে বল্লেন, “হে পরোওয়ারদিগার! এদেরকে বরবাদ করে দাও এবং জাহান্নামে ফেলে দাও”। (মুসনাদে আহমদ ৪র্থ খন্ড, ৪২১পৃষ্ঠা), উল্লেখ্য যে, পরবর্তীতে মুয়াবিয়ার উজির ছিলো আমর ইবনে আস। সে ইমাম আলী (আঃ) এর অনুসারীদেরকে বিকৃতভাবে শাস্তি এবং হত্যা করতো। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, মুহাম্মদ ইবনে আবি বকর (রাঃ) এর হাত-পা কর্তন করে গাধার চামড়ায় পুরে সেটাকে সেলাই করে আগুনে নিক্ষেপ করেছিলো। মুহাম্মদ ইবনে আবি বকর (রাঃ) ছিলেন, হযরত আবু বকর (রাঃ) এর পুত্র এবং ইমাম আলী (আঃ) এর অনুসারী।
অপর দিকে, “ইয়াজিদ খৃষ্টানদের নীতিমালার উপরই প্রশিক্ষণ পেয়েছে। সে মন-মানসিকতার দিক থেকে খৃষ্টবাদের ভক্ত ছিল। সে ছিল অপরিপক্ক, দুষ্টু ও স্বৈরাচারী, উচ্চাভিলাষী, সংকীর্ণমনা, হৃদয়হীন যুবক। তার উস্তাদ ছিলো ‘সারজুন’ নামে এক ইয়াহুদী। সেই শিক্ষকের তত্ত্বাবধানে সে বড় হয়েছে এবং পরবর্তীতে তাকে নিজের উপদেষ্টা বানিয়ে নিয়েছে।” (মুরুজুযযাহাব ৩য় খন্ড, ৭৭ পৃষ্ঠা), ইয়াজিদ ছিল উমাইয়া বংশের পাপ ও নোংরা শয্যার অবশিষ্ট অংশ। সে ছিল কুকুর ক্রীড়ানক এবং মদ্যপায়ী। অপর দিকে, ইয়াজিদের সহযোগী মদিনার গর্ভনর মারওয়ান এবং তার পিতা হাকামকে রাসুল (সাঃ) মদিনা থেকে নির্বাসিত করেছিলেন। মারওয়ান ছিলো হযরত উসমান (রাঃ) এর চাচাতো ভাই। তিনি খলীফা হয়ে বড় বড় সাহাবীদের প্রতিবাদকে উপেক্ষা করে মারওয়ানকে মদিনায় এনে নিজের পরামর্শদাতা নিয়োগ করেন। ইয়াজিদ পিতার অনুসৃত নীতি অনুযায়ী যেখানে প্রয়োজন শক্তিপ্রয়োগ আর যেখানে প্রয়োজন রাজকোষের অর্থ বিলিয়ে ক্ষমতা কুক্ষিগত করার চেষ্টা করা। ইমাম হোসাইন (আঃ) এর শাহাদাত এর পরও এই ধারা অব্যাহত ছিল। যেমন, ৬৩ হিজরীতে ইয়াজীদের জীবনের শেষ দিকে মদিনাবাসীরা ইয়াজিদকে সীমালংঘনকারী, জালেম ও অপরাধী আখ্যায়িত করে তার বিরুদ্ধে জিহাদ ঘোষণা করেন। এ ঘটনা ইতিহাসে “মুররীর যুদ্ধ” বলে খ্যাত । মদিনাবাসীরা ইয়াজিদের গভর্ণর মারওয়ান ইবনে হাকামকে বিতাড়িত করে আব্দুল্লাহ ইবনে হানজালাকে তাদের নেতা নিযুক্ত করে। ইয়াজিদ সেনাপ্রধান মুহরীর নেতৃত্বে ১২ হাজার সৈন্য প্রেরণ করেন। সেনাপ্রধান মুহরীরের প্রতি ইয়াজিদের নির্দেশ ছিল মদিনার শহরবাসীকে তিন দিন যাবত আনুগত্যের আহ্বান জানাবে। আনুগত্য স্বীকার না করলে তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে। আর যুদ্ধ বিজয় লাভ করলে তিন দিন যাবত মদিনাকে সৈন্যদের জন্য মোবাহ বা বৈধ করে দেবে। সুতরাং ইয়াজিদের নির্দেশ অনুযায়ী বিজয় লাভের পরও তিন দিন পর্যন্ত মদিনা শহরে লুটতরাজ এবং গণহত্যা চলে। ইমাম যুহুরীর মতে, সাত শত সম্মানিত এবং দশ হাজার সাধারণ মানুষকে হত্যা করা হয়। নিহতদের মধ্যে আশি জন সাহাবী এবং সাতশত জন ক্বারীও ছিলেন। বর্বর সেনাবাহিনী ঘরে ঘরে প্রবেশ করে মহিলাদের শ্লীলতাহানি করে। ইমাম ইবনে কাসির (রঃ) এর মতে, “বলা হয় এ সময় এক হাজার মহিলা ব্যভিচারের ফলে অন্তসত্বা হয়েছে।”
ইমাম হোসাইন (আঃ) এর শাহাদাত হলো পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি বা বিয়োগান্ত ঘটনা। কারবালার ঘটনায় ইয়াজিদ বাহিনীর বাহ্যিক বিজয় ঘটলেও আসলে তা ছিল ইমাম হোসাইনের বিজয়। যেমন, রাসুল (সাঃ) এর হোদায়বিয়ার চুক্তি পার্থিব দৃষ্টিকোণ থেকে মনে হয়েছিল এটি রাসুল (সাঃ) এর পরাজয়। কিন্তু পরর্বতীতে আল্লাহতা’য়ালা জানিয়ে দিয়েছেন সেটা পরাজয় নয় বিজয় ছিল। একজন মুসলমান এর জীবনের সবচেয়ে বড় ও চূড়ান্ত পর্যায় হলো শাহাদাতের মৃত্যু। ইমাম হোসাইনের শাহাদাত হলো একটি প্রতীক। এই প্রতীকী ঘটনার শিক্ষাকে আমাদের নিজ জীবনে বাস্তবায়নের মধ্যে রয়েছে জীবনের সঠিক সার্থকতা। ইমাম হোসাইন (আঃ) এর জীবন ও কর্ম এবং তাঁর দর্শনের মধ্যে রয়েছে রাসুল (সাঃ) এর প্রকৃত আর্দশ। সেই প্রকৃত শিক্ষা ও আর্দশের আলোকে আমাদের জীবনের সকল দিক ও বিভাগকে আলোকিত ও উজ্জীবিত করতে হবে। ###

Share: