হজরত উমর ও উম্মে কুলসুমের বিবাহের সত্য উন্মোচন

  • Posted: 07/11/2020

এস, এ, আকবার
বিবাহ হচ্ছে একটি ঐশী বিধান, রাসুল (সা.)-এর সুন্নত এবং সকল মানুষের একান্ত ব্যক্তিগত, সামাজিক, পারিবারিক ও দৈহিক চাহিদা। ইতিহাসে এমন অনেক বিবাহের ঘটনা রয়েছে যা বর্ণনার উপযুক্ত এবং শিক্ষণীয়। আবার এমনও কিছু বিবাহ রয়েছে যা ইতিহাসে ঠিকভাবে বর্ণিত হয়নি বা বিকৃত করা হয়েছে। আর সে রকম একটি বিবাহের ঘটনা হচ্ছে হজরত উমর এবং উম্মে কুলসুমের বিবাহের ঘটনা।
হজরত উমর-এর সাথে হজরত আলি (আ.)-এর কন্যা উম্মে কুলসুমের বিবাহ সম্পর্কে একাধিক রেওয়ায়েত তথা বর্ণনা শিয়া ও সুন্নি মতাদর্শের পক্ষ থেকে বর্ণিত হয়েছে। নিম্মে কিছু মতামত উক্ত বিবাহ সম্পর্কে উল্লেখ করা হলো:
১-হজরত উমরের সাথে উম্মে কুলসুমের বিবাহ সংঘটিত হয়নি:
শেইখ মুফিদ (রহ.) সহ আরো কয়েকজন আলেম যেমন: সৈয়দ মির নাসের হুসাইন লাখনাভি এবং শেইখ মোহাম্মাদ জাওয়াদ বালাগি তাদের স্বীয় গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, হজরত উমরের সাথে হজরত উম্মে কুলসুমের বিবাহ সংঘটিত হয়নি।
২- হজরত উমরের সাথে উম্মে কুলসুমের বিবাহটি জোরপূর্বক সংঘটিত হয়:
-অনেকের দৃষ্টিতে উক্ত বিবাহটি জোরপূর্বক সংঘটিত হয়েছিল। সৈয়দ মোর্তজা তার ‘শাফি’ এবং ‘তানযিয়াতুল আম্বিয়া’ নামক গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, উক্ত বিবাহটি জোরপূর্বক সংঘটিত হয়েছিল। (আশ শাফি, খন্ড ৩, পৃষ্ঠা ২৭২, তালখিসে শাফি, খন্ড ২, পৃষ্ঠা ১৬০)
-কুলাইনি তার ‘কাফি’ নামক গ্রন্থে। (আল ফুরুগ মিনাল কাফি, খন্ড ৫, পৃষ্ঠা ৩৪৬ হাদিস নং ১-২)
-কুফি তার ‘আল ইস্তেগাসা’ নামক গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন। (আল ইস্তেগাসা, পৃষ্ঠা নং ৮০- ৮২)
-কাজি নোমান তার ‘শারহুল আখবার’ নামক গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন। (শারহুল আখবার, খন্ড ২, পৃষ্ঠা ৫০৭)
-তুসি তার ‘তামহিদুল উসুল’ নামক গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন। (তামহিদুল উসুল, পৃষ্ঠা ৩৮৬- ৩৮৭)
-তাবারসি তার ‘আলামুল ওয়ারা’ নামক গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন। (আলামুল ওয়ারা, খন্ড ১, পৃষ্ঠা ৩৯৭)
-মাজলিসি তার ‘মারআতুল উকুল এবং বিহারুল আনওয়ার’ নামক গ্রন্থে উক্ত বিবাহ সম্পর্কে উল্লেখ করেছেন। (মারআতুল উকুল, খন্ড ২০, পৃষ্ঠা ৪২, বিহারুল আনওয়ার, খন্ড ৪২, পৃষ্ঠা ১০৯)
৩-হজরত উমরের সাথে ইমাম আলি (আ.)-এর পালিত কন্যার বিবাহ হয়:
-হজরত আবু বকরের কন্যা এবং মোহাম্মাদ বিন আবু বকরের বোন আসমা ছিল ইমাম আলি (আ.)-এর স্ত্রী। আর উম্মে কুলসুম ছিলেন আসমার পূর্বের স্বামীর সন্তান। সুতরাং উম্মে কুলসুম ইমাম আলি (আ.)-এর ঔরসজাত সন্তান ছিল না।
কেননা জাফর বিন আবু তালিব আসমা বিনতে উমাইসকে বিবাহ করেন। জাফরের পক্ষ থেকে দুটি সন্তান জন্মলাভ করে ‘অউন ও জাফর’। পরে জাফরের শাহাদতের পরে হজরত আবু বকর তাকে বিবাহ করেন। হজরত আবু বকরের পক্ষ থেকে উম্মে কুলসুম জন্মগ্রহণ করে। আর উক্ত উম্মে কুলসুমকে হজরত উমর বিবাহ করেন। (এহকাকুল হাক, খন্ড ২, পৃষ্ঠা ৩৭৬, খন্ড ৩, পৃষ্ঠা ৩১৫)
আর এ কারণেই অনেক মুহাদ্দিস এবং ঐতিহাসিকগণ বর্ণনা করেছেন যে, হজরত উমরের সাথে উম্মে কুলসুমের বিবাহ সংঘটিত হয়।
৪- জি¦নদের একটি মেয়েকে হজরত উমর বিবাহ করেন:
-আল্লাহ মানুষকে জি¦ন জাতির উপরে প্রাধান্যতা দান করেছেন। আর হজরত মোহাম্মাদ (সা.) ছিলেন সকল মানব ও জি¦ন জাতির রাসুল। (সূরা সোয়াদ, আয়াত নং ৩৫-৪০)
-অনুরূপভাবে আল্লাহ এবং রাসুল (সা.)-এর পক্ষ থেকে হজরত আলি (আ.) ছিলেন সকল মানব ও জি¦ন জাতির ইমাম। সুতরাং জি¦নদের একটি কন্যার সাথে হজরত উম্মে কুলসুমের সাদৃস্যতা ছিল। আর হজরত উমর সে জি¦ন কন্যাটিকে উম্মে কুলসুম মনে করে বিবাহ করেন। (আল খারায়েজ ওয়াল জারায়েহ, খন্ড ২, পৃষ্ঠা ৮২৫- ৮২৭, বিহারুল আনওয়ার খন্ড ৪২, পৃষ্ঠা ৮৮, ১০২, মারআতুল উকুল, খন্ড ২১, পৃষ্ঠা ১৯৮)
৫- উম্মে কুলসুম নামের কোন মেয়েই ইমাম আলি (আ.)-এর ছিল না:
-ইতিহাসে জয়নাবে কুবরা, জয়নাবে সুগরা এবং রুকাইয়া-এর উপনাম ছিল উম্মে কুলসুম। (আল ইরশাদ, খন্ড ১, পৃষ্ঠা ৩৫৪, বিহারুল আনওয়ার , খন্ড ৪২, পৃষ্ঠা ৭৪, ইনাবিউল মোয়াদ্দাত, খন্ড ৩, পৃষ্ঠা ১৪৭, এহকাকুল হাক, খন্ড ১০, পৃষ্ঠা ৪২৬)
-গবেষকগণ আজও উম্মে কুলসুম নামের কোন কন্যার সঠিক তথ্য উদঘাটন করতে পারেনি। কেননা যদি তার জন্ম হতো তাহলে অবশ্যই তার জন্মস্থান এবং তারিখ ইতিহাসে উল্লেখ করা হতো।
-তবে একটি মত যেখানে শিয়া এবং সুন্নি উভয়েই বর্ণনা করেছেন যে হজরত উমর যখন হজরত জয়নাবকে বিবাহ করে তখন তার বিবাহের দেনমোহর নির্দারণ করা হয় ৪০ হাজার দিনার। আর উক্ত বর্ণনা দ্বারা স্পষ্ট হয় যে যদি হজরত উমরের সাথে কারো বিবাহ হয়েই থাকে তার নাম হচ্ছে জয়নাব না উম্মে কুলসুম। কিন্তু প্রসিদ্ধতা অর্জন করে উম্মে কুলসুম নামে। (তারাতিবুল এদারিয়া, খন্ড ২, পৃষ্ঠা ৪০৫)
৬- উম্মে কুলসুম ছিল এক দাসির সন্তান যাকে হজরত উমর বিবাহ করেছিলেন:
-এক বর্ণনামতে উম্মে কুলসুম হজরত ফাতেমা (সা.আ.)-এর কন্যা ছিলেন না। বরং সে ছিল উম্মে ওয়ালাদ অর্থাৎ দাসি থেকে জন্ম নেয়া সন্তান।
বিভিন্ন গ্রন্থে উল্লেখ করা হয়েছে যে, জয়নাব সুগরা ছিলেন উম্মে ওয়ালাদ। আর উম্মে কুলসুম ছিলেন উম্মে ওয়ালাদ। (মাওয়ালিদুল আয়েম্মা, পৃষ্ঠা ১৫, নুরুল আবসার, পৃষ্ঠা ১০৩, নেহায়াতুল এরাব, খন্ড ২০, পৃষ্ঠা ২২৩)
৭-পারিবারিক জীবন শুরুর পূর্বেই হজরত উমরের মৃত্যু ঘটে:
-বিভিন্ন আলেমগণের মতে যেহেতু হজরত উম্মে কুলসুম ছোট ছিলেন এবং হজরত উমরের সাথে দৈহিক সম্পর্ক হওয়ার পূর্বেই হজরত উমর মারা যান। (মানাকেবে আলে আবি তালিব, খন্ড ৩, পৃষ্ঠা ৮৯, বিহারুল আনওয়ার, খন্ড ৪২, পৃষ্ঠা ৯১)
-অন্যান্য রেওয়ায়েতেও বর্ণিত হয়েছে যে, যেহেতু উম্মে কুলসুম বিবাহের বয়সের তুলনায় অনেক ছোট ছিলেন। সেহেতু হজরত উমরের সাথে বিবাহ হয়েছিল ঠিক, কিন্তু তাদের মধ্যে বয়সের অধিক তারতম্য থাকার কারণে দৈহিক সম্পর্ক সংঘটিত হয়নি এবং অবশেষে হজরত উমর মারা যান। (আল আনওয়ারুল আলাভিয়া, পৃষ্ঠা ৪৩৫)
উক্ত বিষয়টিকে নিয়ে ইতিহাসে বিভিন্নভাবে বর্ণনা করা হয়েছে। তবে উক্ত বিবাহটি সংঘটিত হোক বা না হোক এতে হজরত উমরের জন্য কোন মর্যাদা বা গৌরবের বিষয় ছিল না। কেননা এমন কিছু কারণ ছিল যা উক্ত বিবাহের বিষয়টিকে ম্লান করে দিয়েছে। নি¤েœ উক্ত কারণগুলো উল্লেখ করা হলো:
১- হজরত উমর মাসুম ছিলেন না। কেননা স্বয়ং আহলে সুন্নাতের বর্ণনামতে তিনি অনেকবার ফিকাহ বা মাসআলা বর্ণনার ক্ষেত্রে ভুলের সম্মুখীন হয়েছেন এবং নিজের অপারগতা এবং দূর্বলতাকে স্বীকার করেছেন।
২- হজরত উমর রাসুল (সা.)-এর আহলে বাইত (আ)’এর সম্মান বা মর্যাদাকে তেমন গুরুত্ব দিত না। তবে তিনি রাসুল (সা.)-এর জামাই হওয়ার কয়েকবার বৃথা চেষ্টা করেছিলেন। আর উম্মে কুলসুমকে বিবাহ করার মাধ্যমে তিনি উক্ত মর্যাদাটি অর্জনের চেষ্টা করেছিলেন।
৩- সে যুগে অনেক নারিরা হজরত উমরকে বিবাহ করতে অনিহা প্রকাশ করতো কেননা তিনি ছিলেন উগ্র ও কঠোর মেজাজের। আর এ কারণেই অনেক গোত্রের লোকেরা তাঁর সাথে নিজের মেয়েদের বিবাহ দিতে অনিচ্ছা প্রকাশ করতো।
৪- হজরত আয়েশা আমরু বিন আস এবং মুগাইরা বিন সো’বা-এর কাছে সাহায্য চায় যেন কোন মতেই হজরত উমরের সাথে আবু বকরের কন্যা উম্মে কুলসুমের বিবাহ সংঘটিত না হয়।
৫- এক বছর হজে¦ হজরত উমর এবং মুগাইরা অংশগ্রহণ করে। তখন হজরত উমর উম্মে জামিলকে দেখে বলে মেয়েটি কে? মুগাইরা তাকে বলল: হ্যাঁ, সে হচ্ছে হজরত আলি (আ.)-এর কন্যা উম্মে কুলসুম!
তখন থেকে তিনি উক্ত উম্মে কুলসুমকে বিবাহ করার জন্য চেষ্টা করতে থাকেন এবং বারবার হজরত আলি (আ.)-এর বাড়িতে যাতায়াত করতে থাকেন। জনগণ হজরত উমরের উক্ত বিষয়টিকে ভাল দৃষ্টিতে না দেখার কারণে একবার তিনি বাধ্য হয়ে মেম্বারে আরোহন করে বিষয়টিকে ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা করেন।
৬- হজরত উমর এবং উম্মে কুলসুমের বিবাহের বিষয়টিকে শিয়ারা অস্বীকার করেছে এবং এর বিপরীতে একাধিক দলিল উপস্থাপন করতে বাধ্য হয়েছে। অনুরূপভাবে আহলে সুন্নাত মতাদর্শের লোকেরাও বিষয়টিকে আলোচনা করতে সংঙ্কোচবোধ করে থাকেন। কেননা উক্ত বিষয়টিকে নিয়ে ইতিহাস যেভাবে বর্ণনা করেছে আর মুসলিম জাহানের খলিফার প্রকৃতভাবমূর্তি যেভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে তা হচ্ছে ইসলাম এবং রাসুল (সা.)-এর সুন্নাত বিরোধী। (তাযকেরাতুল খাওয়াস, পৃষ্ঠা ২৮৮)
পরিশেষে বিষয়টির ক্ষেত্রে আমরা বলতে পারি যে, উক্ত বিবাহের ঘটনাটি ইতিহাসে স্পষ্টভাবে বর্ণিত হয়নি। কেননা বিবাহটি স্বেচ্চায় হয়েছিল না-কি জোরপূর্বক, উম্মে কুলসুমের কোন সন্তান জন্মলাভ করেছিল কি-না? সন্তান জন্মলাভ করলে তাদের নাম কি ছিল? সত্যিই কি উম্মে কুলসুমের সাথে হজরত উমরের বিবাহ হয়েছিল? উম্মে কুলসুম কি হজরত আলি (আ.)-এর সন্তান ছিল, না পালিত সন্তান? উম্মে কুলসুম কি হজরত ফাতেমা (সা.আ.)’এর সন্তান ছিল না-কি হজরত আলি (আ.)-এর কোন দাসি বা অন্য কোন স্ত্রীর কন্যা ছিল? উম্মে কুলসুম কখন এবং কিভাবে মারা যায়? কে তার জানাযার নামাজ পড়ায়? আর উক্ত বিষয়গুলো প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত ইতিহাসে অস্পষ্ট থেকে গেছে। আর তাই এ ধরণের অস্পষ্ট বিষয়কে নিয়ে কারো গৌরববোধ করা সমুচিত না।####

Share: