শাবান মাসের ফজিলত ও তার আমলসমূহ

  • Posted: 18/04/2018

সংকলনেঃ শেখ শহীদুল হক
শাবান মাস চন্দ্র মাসের অষ্টম মাস। এ মাস অত্যন্ত সম্মানিত ও মর্যাদাপূর্ণ মাস। এ মাস আখেরী নবী হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ) এর সাথে সম্পর্কিত। পয়গাম্বার (সাঃ) এ মাসে রোজা রাখতেন এবং এই রোজাকে তিনি রমজান মাসের রোজার সাথে সম্পৃক্ত করতেন। আর তিনি বলতেন, শাবান মাস আমার মাস। যে ব্যক্তি আমার এ মাসে একদিন রোজা রাখবে তার জন্য বেহেশত ওয়াজিব হয়ে যাবে।
এ সম্পর্কে ইমাম সাদেক (আঃ) থেকে বর্ণিত রয়েছে যে, যখন শাবান মাসের আগমন ঘটতো হযরত ইমাম জয়নুল আবেদীন (আঃ) স্বীয় আসহাবদেরকে সমবেত করে বলতেন, হে আমার আসহাবগণ! তোমরা কি জান এটা কোন মাস? এ হলো শাবান মাস। রাসুলে আকরাম (সাঃ) বলতেন, শাবান মাস আমার মাস। অতঃপর তোমরা এ মাসে রোজা রাখবে, তোমার পয়গাম্বার (সাঃ) এর মুহাব্বাত ও তোমার পরওয়ারদেগারের নিকটবর্তী হওয়ার জন্য। প্রকৃতপক্ষে ঐ খোদার শপথ, যার কুদরতী হস্তে আলী ইবনে হোসাইনের জীবন অর্পিত। তাকে স্মরণ করে বলছি আমার বাবা হোসাইন ইবনে আলী (আঃ) থেকে শুনেছি যে, তিনি বলেছেন, আমি শুনেছি আমিরুল মুমেনীন (আঃ) থেকে। যিনি শাবান মাসে রোজা রাখলেন তিনি শাবানকে পয়গাম্বার (সাঃ) এর মুহাব্বাত ও খোদার নিকটবর্তী হওয়াকে ভালবাসলেন। আল্লাহ তাকে তার নিকটবর্তী করবেন এবং তাকে তাঁর সম্মানস্বরূপ কিয়ামতের দিনে তার বেহেশত ওয়াজিব করবেন।
শেখ সাফওয়াল জাম্মাল থেকে উদ্ধৃতি দিয়ে বর্ণনা করেন যে, ইমাম সাদেক (আঃ) আমাকে বাধ্য করেছিলেন যারা তোমার আশে পাশে থাকেন তাদেরকে শাবান মাসের রোজার কথা বলতো। আমি বললাম, আপনার জন্য আমার জীবন উৎসর্গ হোক। তুমি কি জান তার মর্যাদা কতটুকু? তিনি বললেন, হ্যাঁ, নিশ্চই রাসুলে খোদা (সাঃ) যখন শাবানের চাঁদ দেখতেন, নির্দেশ দিতেন যাও মদীনাবাসীদের মাঝে উচ্চ কণ্ঠে বলে দাও। হে মদীনাবাসী আমি রাসুলে খোদা হতে এসেছি, রাসুলে খোদা তোমাদের উদ্দেশ্য করে বলেছেন, জেনে রেখ নিশ্চই শাবান মাস আমার মাস। আল্লাহ তাকে রহমত করুক যে আমাকে সাহায্য করবে সে এ মাসে রোজা রাখবে।
এরপর তিনি বলেন, হযরত ইমাম সাদেক (আঃ) হযরত আমীরুল মুমিনীন (আঃ) থেকে বর্ণনা করেন, আমার থেকে শাবানের রোজা দূরীভূত হয়নি। যখন থেকে আমি শুনেছি পয়গাম্বার (সাঃ) এর শাবান সম্পর্কে আহ্বান আমার থেকে শাবানের রোজা কখনো দূরীভূত হবে না যতদিন পর্যন্ত আমি জীবিত থাকবো ইনশাআল্লাহ তায়ালা। অতঃপর তিনি বললেন, শাবান ও রমজান এই দুই মাসের রোজা হলো আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের কাছে তওবা ও মাগফেরাতের।
জেনে রাখ এই পবিত্র মাসের আমল দুই ধরনের। যৌথ আমল ও বিশেষ বা এককভাবে আমল। যৌথ আমলের কয়েকটি নিয়ম আছে।
প্রথমতঃ প্রতিদিন সত্তর বার পড়বে আসতাগফিরুল্লাহ অআস আলুহুত তাওবা।
দ্বিতীয়তঃ প্রতিদিন সত্তর বার পড়বে, আসতাগফিরুল্লাহা আল্লাজি লা ইলাহা ইল্লা হুয়াররাহমানুর রাহীম, আল হাইয়ূল কাইয়ুমু অআতুবু ইলাইহী। রেওয়াতে উল্লেখ রয়েছে, আররাহমানুর রাহীমের পূর্বে আল হাইয়ুল কাইয়ুম। আর এই দুটাই আমল করা উত্তম। আর বিভিন্ন রেওয়াত থেকে প্রতিয়মান হয় যে, এ মাসের সবচেয়ে উত্তম দোয়া ও জেকের হল এস্তেগফার পড়া। যে ব্যক্তি প্রতিদিন এ মাসে সত্তর বার এস্তেগফার পড়বে সে যেন অন্যান্য মাসে সত্তর হাজার বার এস্তেগফার পড়লো।
তৃতীয়তঃ এমাসে দান করবে যদিও একটি খোরামার আধা অংশও হয়। এর বিনিময় আল্লাহতায়ালা তার শরীরকে জাহান্নামের আগুন থেকে হারাম করবে। হযরত ইমাম সাদেক (আঃ) থেকে বর্ণিত আছে। তাঁর কাছে প্রশ্ন করা হয়েছিল রজব মাসের রোজার ফজিলত সম্পর্কে তিনি বললেন ঃ কেন শাবান মাসের রোজা থেকে গাফিল বা উদাসিন রয়েছো? তিনি আরজ করলেনঃ হে ইবনে রাসুলুল্লাহ যদি কেউ একদিন শাবান মাসের রোজা রাখে তার কি সওয়াব হবে? তিনি বললেনঃ আল্লাহর কসম, তার সওয়াব হল তার বেহেশত। তিনি আবারো আর্জি করেন, হে ইবনে রাসুলুল্লাহ এমাসে উত্তম আমল কি? তিনি বললেনঃ দান করা ও এস্তেগফার করা। যে ব্যক্তি শাবান মাসে দান করবে আল্লাহ তায়ালা তাকে প্রশিক্ষণ দিলো যেমনভাবে তোমাদের কেউ উটের বাচ্চাকে প্রশিক্ষণ দেয়। যাতে করে কিয়ামতের দিন তার মালিকের নিকট পৌছাতে পারে। যেন তার অবস্থা অহুদ পাহাড়ের ন্যায় দৃঢ় হতে পারে।
চতুর্থতঃ পুরো এ মাসটি ধরে এক হাজার বার পড়বে লাইলাহা ইল্লাল্লাহু অলা নায়াবুদু ইল্লাইয়াহু মুখলেসিনা লাহুদ দ্বীন, অলাও কারিহাল মুশরেকুন। এতে প্রচুর সওয়াব রয়েছে যেন এক হাজার বছরের ইবাদাত তার আমলে লেখা হলো।
পঞ্চমতঃ এ মাসের প্রত্যেক বৃহস্পতিবার দুই রাকাত নামাজ পড়বে, যার প্রতি রাকাতে সুরা হামদের পর ১০০ বার তৌহিদ পাঠ করবে। আর সালাম ফিরানোর পর ১০০ বার দরুদ পাঠ করবে যাতে আল্লাহতায়ালা তার ইহকাল ও পরকালে তার আশা পূর্ণ করেন এবং তার রোজা ও মর্যাদা পূর্ণ হয়। এছাড়া বর্ণিত রয়েছে যে, আল্লাহ শাবান মাসের প্রতি বৃহস্পতিবার আসমানকে সৌন্দর্য্যমন্ডিত করেন অতঃপর ফেরেশতা আর্জি করবেন, হে খোদা এই রোজাদারদেরকে তুমি ক্ষমা করে দাও এবং তাদের দোয়াকে তুমি কবুল করে নাও। নবী করীম (সাঃ) থেকে বর্ণিত, যে এ মাসের সোমবার ও বৃহস্পতিবার রোজা রাখবে আল্লাহ তায়ালা তার দুনিয়ার বিশটি ইচ্ছা ও আখেরাতের বিশটি ইচ্ছা পূরণ করবে।
যষ্ঠতঃ এমাসে অসংখ্য দুরুদ পাঠ করবে।
সপ্তমতঃ শাবানের প্রতিদিন (যাওয়াল) অর্থাৎ সূর্য পশ্চিম দিকে ঢলে পড়লে এবং মধ্যরাতে জিয়ারাতে ইমাম জয়নুল আবেদীন (আঃ) নামে পরিচিত সেই দোয়া পাঠ করবে যা মাফাতিহুল জানান নামক দোয়া বইতে শাবান মাসের আমল পৃষ্ঠায় উল্লেখ করা হয়েছে। এ ব্যাপারে ঐ পুস্তকে আরো দোয়া উল্লেখ করা হয়েছে। ###

Share: