সূরা আল-ক্বদরের ফজিলত, আগুন পানিতে পরিণত হল

  • Posted: 25/05/2018

মূলঃ মুহাম্মাদ আব্দূল লাহিয়ান, অনুবাদঃ মাওঃ মোঃ শহীদুল হক
বনি আব্বাসিয় খলিফাদের অন্যতম খলিফা ছিলেন মুনসুর দাওয়ানিকী। বনি আব্বাসিয় খেলাফাত প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে তার ভূমিকা ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ। প্রথম খলিফা আব্বাসের পর তিনি খেলাফতে অধিষ্ঠিত হন। তিনি আব্বাসিয় সভ্যতার মূল ভিত্তি স্থাপনকারী ছিলেন। তার সময় গুরুত্বপূর্ণ বাগদাদ নগর গড়ার কার্যক্রম শুরু হয়।
তার মধ্যে মতোবিরোধীদের দমন নিপীড়নের মাধ্যমে ক্ষমতার কর্তৃত্ব আয়ত্বে আনার দুঃসাহসিক খায়েশ সৃষ্টি হওয়ায় তিনি তার প্রকৃত ও সম্ভবপর সকল বিরোধীদের মুলোৎপাটনের নীতি শুরু করলেন। এমনকি আবু মুসলিম যিনি আব্বাসের খাদেম ছিলেন তাকেও প্রতারণার মাধ্যমে হত্যা করেন। এই জুলুম ও অত্যচারের ধারাবাহিকতার মধ্যে সবচেয়ে বেশী নির্যাতন চালায় বনি ফাতেমার উপর, যার ফলে তাকে মর্মান্তিকভাবে শাহাদাত বরণ করতে হয়। মুনসুরের রাবী নামক একজন কর্মচারী ছিলেন যিনি রাষ্ট্রের দ্বিতীয় ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত ছিলেন। কারণ তিনি একই সাথে দুটি গুরুত্বপূর্ণ পদের দায়িত্ব পালন করতেন।
তিনি উজিরের পাশাপাশি ঘনিষ্ঠ দেহরক্ষীও ছিলেন। একসময় তাঁকে এই দুইপদ থেকে পদোন্নতি দিয়ে দরবারের প্রধান উজির নির্বাচিত করা হয়।
হযরত ইমাম সাদেক (আঃ) এর ইমামতী যুগের কিছুকাল মুনসুর ও তার উজির রাবীর দীর্ঘ খেলাফতের মধ্যে অতিবাহিত হয়।
মুনসুর হযরত ইমাম সাদেক (আঃ)কে খুব ভালভাবেই চিনতেন। তিনি জানতেন যে হযরত ইমাম সাদেক (আঃ) মুসলিম উম্মাহ এর মধ্যে একজন গুরুত্বপূর্ণ ও ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব হিসাবে পরিচিত এবং এক বিশেষ সম্মান ও মর্যাদার অধিকারী। সকল বিরোধীদেরকে নির্যাতন, নিপীড়ন ও হত্যার মাধ্যমে দমন করে মুনসুর সকল ক্ষেত্রে দুশ্চিন্তা মুক্ত হওয়ার পরও তাকে যে জিনিসটা বেশী কষ্ট দিচ্ছিল তা হলো হযরত ইমাম সাদেক (আঃ) এর অস্তিত্ব ও তাঁর জীবিত থাকাটা। আর এ কারণে তার পথের কাঁটা দূর করার উদ্দেশ্যে হযরত ইমাম সাদেক (আঃ)কে নয় বার বাগদাদ ও মদীনায় ডেকে পাঠান তাকে হত্যা করার জন্য। যার অধিকাংশ ক্ষেত্রে খলিফার উজির রাবী স্বয়ং উপস্থিত ছিলেন এবং কখনো কখনো হযরতকে আকৃষ্ট করা ও তাঁকে ডেকে পাঠানোর ব্যাপারে বিশেষ ভূমিকা রেখেছিলেন। তিনি উল্লেখ করেন যে, আমি খলিফার সাথে মদীনার অভিমুখে যাচ্ছিলাম পথিমধ্যে খলিফা আমাকে বললো, হে রাবী এবার জাফর বিন মুহাম্মাদকে হত্যা করবো। আর এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের জন্য কসম খেল। সে আমাকে বললো, যখন আমরা মদীনায় পৌঁছাবো তখন তাকে এই সিদ্ধান্ত ও কসমের কথা স্মরণ করিয়ে দিতে। যখন মদীনায় পৌঁছালাম আমাকে নির্দেশ দিলো হযরতকে ডেকে আনতে। আমি যখন হযরতের খেদমতে উপস্থিত হলাম এবং তাঁকে মুনসুরের ভয়ংকর সিদ্ধাতের কথা জানালাম তখন হযরত কোন দুঃশ্চিন্তা ছাড়াই দোয়া পড়ায় মশগুল হলেন, আমি বুঝতে পারলাম না তিনি কোন দোয়া পাঠ করছেন। যখন মুনসুরের নিকট ফিরে গেলাম, দেখলাম মুনসুর তলোয়ারটা প্রস্তুত করে মুসাহিবের হাতে দিলো যাতে তার ইঙ্গিতে হযরতকে হত্যা করা হয়।
হযরত তখনও দোয়া পড়ছিলেন। আমি মুনসুরের চেহারার দিকে বিষ্ময়বিহবল দৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখতে লাগলাম তিনি কি করেন। হঠাৎ দেখলাম মুনসুরের ক্রদ্ধ ও হিংস্রতা নিস্তেজ হয়ে পড়ে ঠিক যেন পানি আগুনকে নিভিয়ে দিলো। সেও শান্ত হয়ে গেল। তখন সে হযরতকে তার পাশে বসিয়ে বললো: এখানে কষ্ট করে ডাকার উদ্দেশ্য হলো আলাভীদের ব্যাপারে অভিযোগ করার জন্য। লোকজনকে তারা আমার বিপক্ষে বিদ্রোহী করে তুলছে ও রাস্তাঘাটে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছে। হযরত তাকে ধৈর্য্য ও সবর করতে বললেন, অতঃপর মুনসুর একটি হাদীস শোনানোর অনুরোধ জানালো। পূর্বেও তাঁর কাছে এ ধরণের প্রস্তাবের মাধ্যমে সে আন্তরিকতা দেখিয়েছিল। হযরত কয়েকটি হাদীস বর্ণনা করেন যা মুনসুরের দৃষ্টি আকৃষ্ট করেছিল। এরপর নির্দেশ দিয়েছিল হযরতকে খুব সম্মানের সাথে তার বিশেষ ঘোড়ায় চড়িয়ে তাঁর বাড়িতে পৌঁছে দিতে । এই ঘটনাটি খুবই বিষ্ময়কর ছিল যা রাবীর অন্তরে ভীষণ প্রভাব ফেলেছিল ।
যখন মুনসুর বাগদাদে থাকতো তখন সপ্তাহে একবার ‘কোববাতুল খাদরাহ’ নামক স্থানে উপস্থিত হতো। যখন উপস্থিত হতো সকলে বুঝতে পারতো ঐ দিনটা অলুক্ষুণে দিন, কারণ ঐ স্থানে আজ কোন না কোন ব্যক্তি নিহত হবে। মুহাম্মাদ ও ইব্রাহীম, আব্দুল্লাহ বিন হাসানের পুত্রদ্বয়ও ঐ স্থানে নিহত হয়েছিল। এ কারণে ‘কোব্বাতুল খাদরাহ’ পরিচিত লাভ করেছিল। রাবী বলেন নিয়মানুযায়ী একদিন মুনসুর এই স্থানে উপস্থিত হলো। ভীষণ ক্রোধ ও আক্রোশ নিয়ে অপেক্ষা করতে লাগলো, কিন্ত কোন ঘটনা আর ঘটলো না। ইতিমধ্যে সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসলো, আমি বাড়ীতে ফিরে গেলাম। মধ্যরাতে মুনসুরের পেয়াদা আমাকে ডাকতে আসলো আমি ভীত-সন্ত্রস্ত অবস্থায় মুনসুরের নিকট হাজির হলাম। দেখলাম সে তখনও পর্যন্ত ‘কোব্বাতুল খাদরায়’ অপেক্ষা করছে, তার চোখে ক্রোধ ও ক্লান্তি এবং ঘুম না হওয়ার ছাপ পরিলক্ষিত হচ্ছে। আমার দিকে তাকিয়ে বললো: হে রাবী তুমি ভালভাবে জানো যে আমার নিকট তোমার স্থান কোন পর্যায়ের, আমার সমস্যা শুধু তুমিই সমাধান করতে পারবে। বললাম, হে আমীরুল মু’মিনিন আমি যা কিছু পেয়েছি সবই আল্লাহর রহমত ও আমীরের দয়ায়। আমীরের খেদমতে কোন কার্পণ্য করবো না। যখন মুনসুর আমার মুখে এ কথা শুনলো খুশি হয়ে আমাকে বললো: এখন মদীনায় জাফর বিন মুহাম্মাদের কাছে যাবে তাকে যে অবস্থায় যে পোষাকে পাবে সে অবস্থায় টানতে টানতে আমার নিকট হাজির করবে। নির্দেশ পালনের জন্য আমি বের হলাম এবং মনে মনে বললাম: কি বিপদে না পড়লাম, আমার আখেরাতও বরবাদ করলাম। অবশ্যই জাফর বিন মুহাম্মাদকে আনার পর তাকে হত্যার জন্য আমাকে নির্দেশ দিবে। মুনসুরের আক্রোশ এত বেশি ছিল যে, আমার বিশ্বাস ছিল তাকে হত্যা করবেই। বাড়ীতে গিয়ে আমার ছেলেকে এই নির্দেশ পালনের জন্য হযরতের নিকট পাঠালাম। সে ঐ রাত্রেই বাগদাদ থেকে মদীনা অভিমুখে রওনা দিলো। রাবীর ছেলে বললো: যখন হযরতের বাড়ীতে পৌঁছালাম প্রাচীর টপকিয়ে ভিতরে গিয়ে হযরতের কক্ষে উপস্থিত হলাম দেখলাম তিনি একটা সাধারণ পোষাক পরে নামাজ পড়ায় মশগুল রয়েছেন। তাঁর নামাজ সমাপ্ত না হওয়া পর্যন্ত দাঁড়িয়ে থাকলাম। এরপর বললাম, হে রাসুুলের সন্তান! আমীরুল মু’মিনিন মুনসুরের দাওয়াত কবূল করুন। হযরত বললেন: হে রাবীর পুত্র! সময় দাও যাতে পোষাক পরে প্রস্তুত হই। বললাম এ ধরণের কোন অনুমতি নেই । আপনাকে এক্ষুণি এ অবস্থায় মুনসুরের নিকট নিয়ে যেতে হবে। মাথা ও পা খালি অবস্থায় রওনা দিলাম। মদীনা থেকে বাগদাদ এই দীর্ঘ পথ এই অবস্থায় অতিক্রম করলাম। পথিমধ্যে কয়েকবার হযরত দুর্বল হয়ে পড়লেন। ‘দারুল ইমারার’ নিকটবর্তী হলে তাঁকে পিতার হাতে সোপর্দ করলাম। রাবী হযরতের জামার হাতাটা ধরে মুনসুরের নিকট নিয়ে গেলেন। যখন মুনসুরের দৃষ্টি হযরতের উপর গিয়ে পড়লো তখন সে বললো। হে জাফর! এ কোন ধরণের ফ্যাসাদ ও বিভ্রান্তি সৃষ্টি করছো? কেন বনি আব্বাসীদের প্রতি এত বিদ্বেষ? অস্তগামিতার মধ্যে এই পরিবার থেকে খেলাফাতের নেয়ামতটা নেওয়ার চেষ্টা করছো কেন? অথচ এতে তোমার কোন উপকার আসবে না। হযরত বললেন: হে মুনসুর! তুমি খুব ভালভাবে জানো যে আমার তেমন ইচ্ছা নেই, মুনসুর কালক্ষেপন না করে যদিও তার হাতে তলোয়ার ছিল, হাতের মধ্যে থেকে একটি চিঠি তাঁর দিকে নিক্ষেপ করে বললোঃ  পড় তুমি যা এই চিঠিতে আমাদেরকে দুর্নাম করেছো এবং আব্বাসীয়দের খেলাফত ধ্বংসের আশা করেছ। হযরত এ চিঠির কথা সম্পূর্ণ অস্বীকার করেন কিন্তু মুনসুর বহু পীড়াপীড়ি করলো চিঠিটা তার বলে। তখন সে তলোয়ারটা নিয়ে তার নিকটে গেল কিন্তু হঠাৎ থেমে গিয়ে নিজ জায়গায় ফিরে আসলো। এই ঘটনাটি ঐ রাত্রে তিনবার পুনরাবৃত্তি হলো। আমি মনে মনে বিশ্বাস করেছিলাম চতুর্থবার হয়তো আমার হাতে তলোয়ার দিবে হযরতকে হত্যা করার জন্য? কিন্তু আশ্চর্য্য হয়ে দেখলাম এবারও মুনসুর শান্ত হয়ে গেল, মুহুর্তে খুব আন্তরিক ও সোহাদ্যপূর্ণ ভাব দেখালো। যে কাজটা জাফর-বিন মুহাম্মাদের ব্যাপারে মুনসুরের দ্বারা করা সম্ভব ছিল না। আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম যদি মুনসুর আমাকে নির্দেশ দেয় হযরতকে হত্যা করতে তাহলে তাকেই হত্যা করবো। আর এটাও ভালভাবে জানতাম যে এর পরিনামে আমার ও আমার পরিবারের কি মুসিবাত আসবে। মুনসুর আমাকে নির্দেশ দিল হযরতকে যথাযথ মর্যাদার সাথে বাড়ীতে পৌঁছে দিতে। হযরত আমার আকীদা ও বিশ্বাসের ব্যাপারে যথেষ্ট অবগত ছিলেন এবং তিনি জানতেন আমি তাকে কত মুহাব্বাত করি? কিন্তু আমি বাধ্য ছিলাম আমার আক্বীদাকে গোপন রাখতে। একারণে আমার মধ্যে প্রশ্ন জাগতো কিভাবে ইমাম ঐ বিপদজনক পরিস্থিতি থেকে বিস্ময়করভাবে মুক্তি পাচ্ছেন? ইতিমধ্যে এই বিস্ময়কর ও ব্যতিক্রমধর্মী পরিস্থিতির একজন চাক্ষুস সাক্ষী হওয়ায় হযরতের কাছে প্রশ্ন করেছিলাম, হে রাসুলের পুত্র! কোন আমলের ফলে আপনি বার বার মুনসুরের ক্রোধ ও আক্রোশ থেকে নিরাপদ থেকেছেন। হযরত দোয়ার কথা উল্লেখ করে বললেন: হে রাবী! আমি নিজেকে সূরা কদর পড়ার মাধ্যমে মুনসুরের অপকর্ম থেকে রক্ষা পেয়েছি। হে রাবী! যে কেউ এ ধরণের বিপদের সম্মুখীন হবে সে এ সূরা কদর পাঠ করলে রক্ষা পাবে। যদি আমাদের ও আমাদের শিয়াদের দ্বারা সূরা কদর পাঠ না হত তাহলে যে কোন ভাবেই শত্রুরা, আমাদেরকে তাদের ক্রোধ ও অত্যাচারের মধ্যে ফেলে শেষ করে দিতো আল্লাহর কসম এই সূরা আমাদের ও আমাদের শিয়াদের আশ্রয়স্থল। (সূত্রঃ ম্যাগাজিন বেশারাত, সংখ্যা ২৬)###

Share: