জান্নাতুল বাক্বী

  • Posted: 06/07/2018

মাওলানা শেখ আলী আকবর

মক্কা মুকাররমার কবরস্থান হলো জান্নাতুল মুআল্লা। আর মদিনা মুনাওয়ারার কবরস্থান হলো-জান্নাতুল বাকি। এর মূল নাম হলো- ‘বাকিউল গারকাদ’।
আরবী ভাষায় বাক্বি শব্দের অর্থ হচ্ছে যেখানে বিভিন্ন প্রকারের জঙ্গলি বৃক্ষ ও ঝোপ-ঝাড় রয়েছে। বাক্বি গ্বারক্বাদ হচ্ছে এমন এক স্থান যেখানে গ্বারক্বাদ নামক কাঁটাযুক্ত বৃক্ষ বেশী ছিল। আর এই কারণে তার নামকরণ করা হয় বাক্বি গ্বারক্বাদ। এছাড়াও মদীনায় বাক্বি নামের বিভিন্ন স্থান রয়েছে যেমন: বাক্বি খানজাবা, বাক্বি বোতহান, বাক্বিউল খিল। কিন্তু বর্তমান বিশ্বে যখন বাক্বির প্রসঙ্গ আসে তখন শুধুমাত্র জান্নাতুল বাক্বি গ্বারক্বাদকে বুঝানো হয়। কারণ কাঁটা বিশিষ্ট বড় গাছকে গ্বারক্বাদ বলা হয়।
বাক্বি গ্বারক্বাদ নামক কবরস্থানটি মদীনার পূর্বদিকে অবস্থিত। যখন মুহাজিররা মক্কা থেকে মদীনায় হিজরত করেন তখন উক্ত স্থানে সভ্যতার রক্ষণা বেক্ষণ এবং উন্নয়নের কাজ শুরু হয়। তখন রাসুল (সা.) চিন্তা করেন মুসলমানদের দাফনের জন্য একটি উপযুক্ত স্থান খুঁজছিলেন এমতাবস্থায় তিনি বলেন: আমাকে এই স্থান সম্পর্কে নির্দেশ দেয়া হয়েছে যেন এখানে আমি একটি কবস্থান তৈরী করতে পারি। (মুতাদরাক ইমাম হাকিম, খন্ড ১১, পৃষ্ঠা ১৯৩)
জান্নাতুল বাক্বির চারিধারে লোকজনের বাড়ি ছিল। তন্মধ্যে হযরত আক্বিলের একটি ঘর ছিল যাকে “দারুল আক্বিল” বলা হতো। পরবর্তিতে যখন লোকজন উক্ত বাগানে নিজেদের ঘরে নিজেদের আত্মীয়-স্বজনদের দাফন করা শুরু করে তখন দারুল আক্বিল রাসুল (সা.)এর পরিবারের কবরস্থানে পরিণত হয় এবং এই স্থানকে বনি হাশিমের কবরস্থান বলা হতো। কালের আবর্তনে বাগানের গাছপালাগুলো কেটে ফেলা হয় এবং অবশেষে তা পরিপূর্ণভাবে কবরস্থানে রূপান্তরিত হয়। বনি হাশিমের পারিবারিক কবরস্থানে ইমামদের (আ.) কে দাফন করা হয়। জান্নাতুল বাক্বি সর্বপ্রথম আক্বিল ইবনে আবু তালিবের ঘরের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। পরবর্তিতে তা মসজিদে রূপান্তরিত হয়। জান্নাতুল বাকিতে চারজন ইমামের দাফনের পরে তা শিয়াদের জন্য একটি ধর্মীয় কেন্দ্ররূপে গড়ে উঠে। চারজন ইমামের কবর থাকার কারণে জান্নাতুল বাক্বির গুরুত্ব ও মর্যাদা আরো বেড়ে যায়। ইমামদের কবরের উপরে যে মাজার তৈরী করা হয়েছিল তা অনেক বছর যাবৎ ঐরূপভাবেই ছিল। সারযুখির উজির মাজদুল মুলকের নির্দেশে একটি দৃষ্টিনন্দন উচু গুম্বুজ বিশিষ্ট মাজার তৈরী করেন। মাজারটি প্রত্যেক বছর মেরামত করা হতো এবং তার সাথে সাথে তাঁর আয়তনও বৃদ্ধি করা হতো। ব্রিটিশদের ষড়যন্ত্রমূলক কুপরামর্শে এবং ইবনে তাইমিয়ার জাল রেওয়ায়েত বর্ণনার মাধ্যমে সৌদি রাজতন্ত্র আলে সৌউদে আব্দুল্লাহ ইবনে ওহাবের তত্ত্বাবধানে ওহাবী নামক এক কুসংস্কারমূলক বাতিল ফেরক্বা রূপ লাভ করে। ইবনে তাইমিয়া তার অনুগত এবং সৌদি রাজতন্ত্রের পৃষ্ঠপোষকতায় ইসলামী স্থাপত্য, মাজার ও জলিলুল ক্বদর সাহাবীদের কবরগুলোকে ভেঙ্গে ফেলার ফতোয়া দেয়। ওহাবীরা নিজেদের স্বার্থ সিদ্ধির জন্য সর্বপ্রথম শহীদদের সর্দার ইমাম হুসাইন (আ.)এর মাজারকে ভেঙ্গে দেয় এবং চার হাজারেরও বেশী মুলসমানদেরকে হত্যা করে। কিন্তু পরবর্তিতে ইরাকে ওহাবীদের তৎপরতা কমে গেলে মুমিনরা পুণরায় ইমাম হুসাইন (আ.)এর মাজারকে পুঃনির্মাণ করে। তারপরেও ওহাবীরা থেমে থাকেনি বরং তারা আদি মাতা হযরত হাওয়া (আ.)এর কবরকে ভেঙ্গে ফেলে। তারা ইসলামের প্রথম মুসলিম নারী হযরত খাদিজা (রা.) এবং হযরত আলী (আ.)এর পিতা আবুতালিবের সুসজ্জিত কবরকে ভেঙ্গে দেয়। তার পরেও তারা শান্ত হয়নি বরং তারা মদীনায় অবস্থিত ইসলামের সাহসী সৈনিক হযরত হামযা (রা.) এবং ওহদের যুদ্ধ শাহাদতবরণকারী সাহাবীদের কবরকেও ধ্বংস করে দেয়। ইস্ফাহানের সুদক্ষ শিল্পির কারুকার্যের কারণে জান্নাতুল বাক্বি নামক কবরস্থানে অবস্থিত ইমাম (আ.)দের মাজারটির সৌন্দর্যতা আরো বৃদ্ধি পায় এছাড়া বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মুমিনরা অতি মূল্যবান ঝাড়বাতি, গালিচাসহ বিভিন্ন জিনিষ মাজারটিতে হাদীয়া করেছিল। ইমামদের মাজারে মুমিনরা স্বেচ্ছায় খেদমত করতো এবং জান্নাতুল বাক্বিতে অবস্থিত ইমাম (আ.) এবং জলিলুল ক্বদর সাহাবীদের কবর যিয়ারত করার জন্য বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে দলে দলে মুমিনদের সমাগম ঘটতো। কিন্তু এই দিনে মদীনার ওহাবী বিচারকের নির্দেশে ওহাবি মতাদর্শীরা জান্নাতুল বাক্বিতে অবস্থিত জলিলুল ক্বদর সাহাবী এবং ইমাম (আ.)দের মাজারে হামলা করে সেখানে অবস্থিত মূলবান জিনিষসমূহকে লুট করে নেয়। ওহাবীরা জান্নাতুল বাক্বিতে অবস্থিত ইসলামী স্থাপত্য ও সাহাবী ও ইমামদের কবরসমূহকে সম্পূর্ণভাবে নিঃচিহ্ন করে দেয়। আর এইভাবে তারা বিশ্বের মুমিনদের ঈমানী চেতনায় আঘাত হানে। কিন্তু আজও মুমিনদের চাই যেন জান্নাতুল বাক্বিতে শায়িত ইমাম (আ.)গণ এবং জলিলুল ক্বদর সাহাবীদের কবরের উপরে পুণরায় গুম্বজ বিশিষ্ট মাজার তৈরী করা হোক।####

Share: