হযরত আমীর মুসলিমের শাহাদাত

  • Posted: 20/08/2018

হযরত মুসলিম ইবনে আকিল ছিলেন সৈয়্যেদুশ শুহাদা হযরত ইমাম হোসাইন (আঃ) এর চাচাতো ভাই। ইমাম (আঃ) এর নির্দেশ পাওয়ার সাথে সাথে হযরত মুসলিম কুফার উদ্দেশ্যে যাত্রা করলেন। উদ্ভূত পরিস্থিতির কারণে তার যাত্রার উদ্দেশ্য ছিল হুজ্জত তামাম করা। যাত্রার শুরুতেই তিনি দেখলেন এক শিকারী একটি হরিণ শিকার করে ছুরী দিয়ে জবেহ করলো। তিনি ভাবলেন এই ঘটনাটি ইমাম (আঃ)কে জানানো উচিত। সুতরাং তিনি ইমামের নিকট ফিরে গেলেন এবং ঘটনাটি বললেন। ইমাম তার সাফল্যের জন্য দোয়া করলেন এবং তাকে রওয়ানা হওয়ার নির্দেশ দিলেন। মুসলিম ইমাম (আঃ) এর পবিত্র হস্ত ও পদযুগলে চুম্বন করে অশ্রুসজল চোখে মক্কা থেকে যাত্রা করলেন। তাঁর দুই পুত্র মোহাম্মাদ এবং ইব্রাহিম মদীনায় ছিলেন। সুতরাং মুসলিম মক্কা থেকে রওয়ানা হয়ে মদীনায় পৌঁছলেন, সেখানে পবিত্র রওজা মুবারকের জিয়ারত ও নামাজ আদায় করে বেরিয়ে এলেন। রাত মদীনায় কাটিয়ে দুই শিশু সন্তানকে নিয়ে পথ প্রদর্শক দুই ব্যক্তির সাথে কুফার উদ্দেশ্যে যাত্রা করলেন। কুফা পৌঁছে তিনি মোখতারের গৃহে অবস্থান করলেন। কিছুদিনের মধ্যেই প্রায় আঠার হাজার কুফাবাসী তার বায়াত করলো। পরবর্তীতে এই সংখ্যা প্রায় ত্রিশ হাজারে গিয়ে দাঁড়ায়। ইয়াজিদ বসরার শাসনকর্তা ইবনে জিয়াদকে এই মর্মে পত্র লিখলো যে, হোসাইনের (আঃ) ভাই মুসলিম কুফায় এসে পৌঁছেছে। সুতরাং তুমি কুফায় গিয়ে নোমান ইবনে বশীর থেকে দায়িত্ব বুঝে নাও।
ইবনে জিয়াদের কুফা আগমনের সংবাদ যখন হযরত মুসলিম পেলেন তিনি তখন মোখতারের গৃহ থেকে হযরত হানীর গৃহে গিয়ে উঠলেন। মোয়াক্কেল নামের জনৈক ব্যক্তিদ্বারা সংবাদ নিয়ে ইবনে জিয়াদ হযরত হানীকে দরবারে তলব করলো। নিরুপায় হয়ে হযরত হানী স্বীকার করলেন যে, তার গৃহে হযরত মুসলিম অবস্থান করছেন। ইবনে জিয়াদ হযরত মুসলিমকে তার হাতে তুলে দেয়ার জন্য হানীকে বললো। কিন্তু হানী উত্তরে বললেন, অসম্ভব, আমি তা পারবো না। ইবনে জিয়াদ হানীকে গ্রেফতার করলো। অতঃপর জিয়াদ নব্বই বছরের বৃদ্ধকে খুঁটির সাথে বেঁধে পাঁচ হাজার বেত্রাঘাত করার নির্দেশ দিল। হযরত হানী জ্ঞান হারালেন। এরপর তার মস্তক দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন করে শূলে চড়ান হয়।
হযরত মুসলিম যখন হযরত হানীর গ্রেফতার হওয়ার সংবাদ পেলেন, তিনি তার শুভাকাংখীদের সাথে বাইরে বেরিয়ে এলেন এবং তুমুল যুদ্ধে লিপ্ত হলেন। কিন্তু ইবনে জিয়াদের সেনা কর্মকর্তাদের ভীতি প্রদর্শন ও প্ররোচনার ফলে মুসলিমের শুভাকাংখী ও সঙ্গী সাথীরা তাকে ধীরে ধীরে ছেড়ে চলে যেতে লাগল। এমনকি মাগরেবায়নের নামাজের সময় তাঁর সাথে মাত্র ত্রিশজন অবশিষ্ট ছিল। তিনি নামাজ শেষে যখন সালাম ফেরান তাঁর পিছনে কোন মুকতাদী ছিল না। আশ্রয় পাওয়ার মত কোন গৃহ ছিল না। সেই মুহূর্তে মোহাম্মাদ ইবনে কাছির উদিত হলেন। নিজের গৃহে মুসলিমকে আশ্রয় দিলেন। ইবনে জিয়াদ কাছির এবং তার পুত্রকে দরবারে তলব করলো। কাছিরের অনুসারী ও শুভাকাংখীদের সাথে দরবারে উপস্থিত লোকদের সাথে তুমুল যুদ্ধ বেধে গেল। অবশেষে এই দুই পিতা ও পুত্র শাহাদাতের অমীয় সূধা পান করলেন। হযরত মুসলিমের কানে যখন এই পিতা পুত্রের শহীদ হওয়ার সংবাদ পৌঁছালো তখন তিনি ভাবলেন যে, কুফা থেকে বেরিয়ে যাওয়ার কোন রাস্তা যদি পাওয়া যেত তাহলে বেরিয়ে পড়তেন। এই ভেবে তিনি দোদুল্যমান চিত্তে ঘোড়ার পিঠে সওয়ার হয়ে কুফার প্রতিটি দরজায় গেলেন কিন্তু প্রতিটি দরজায় ইবনে জিয়াদের দুই সহস্রাধিক সৈন্য বাহিনী পাহারা দিচ্ছিল। তিনি পথ খুঁজে পেলেন না। ঘোড়া প্রধান রাজপথ ছেড়ে দিয়ে একটি গলিতে প্রবেশ করল এবং একটি জীর্ণ মসজিদে মুসলিম আশ্রয় নিলেন। ইবনে জিয়াদ তার আত্মগোপনের সংবাদ শোনার পর ঘোষণা করলো যে, মুসলিমকে যদি কেউ জীবিত অথবা মৃত ধরিয়ে দিতে পারে তাহলে তাকে প্রচুর পুরস্কার দেয়া হবে। হযরত মুসলিম দিনের বেলায় মসজিদে কাটালেন। রাতে মসজিদ থেকে বেরিয়ে পড়লেন। ক্ষুধা ও তৃষ্ণায় তিনি হাঁটতে পারছিলেন না। একটু আশ্রয়ের জন্য তিনি এদিক থেকে ওদিক ছুটে বেড়াচ্ছিলেন। সেই মুহূর্তে এক বৃদ্ধার দিকে তার দৃষ্টি পড়লো। তিনি তৃষ্ণা নিবারনের জন্য বৃদ্ধার কাছে একটু পানি চাইলেন। বৃদ্ধা পানি দিয়ে কোথায় যাবে জানতে চাইল। মুসলিম দুর্বল কণ্ঠে বললেন, “হে বৃদ্ধা, যার কোন ঘর নেই সে কোথায় যাবে?” বৃদ্ধা জিজ্ঞাসা করলো, “আপনি কে, কিইবা আপনার পরিচয়?” মুসলিম বললেন, “আমি নবী মোস্তফা (সাঃ) ও ইমাম আলী (আঃ) এর ভ্রাতুষ্পুত্র ও ইমাম হোসাইন (আঃ) এর চাচাতো ভাই মুসলিম ইবনে আক্বীল। বৃদ্ধা পরিচয় জানার পর মুসলিমকে তার গৃহে আশ্রয় দিল। রাত নির্বিঘেœ কাটলেও ভোর হওয়ার সাথে সাথে শত্রু বাহিনী বৃদ্ধার ঘরটিকে ঘিরে ফেললো। আসলে পূর্বেই বৃদ্ধার পুত্র তার মায়ের অজান্তে হযরত মুসলিমের সংবাদ দরবারে পৌঁছে দিয়েছিল। যাই হোক প্রায় তিনি সহস্রাধিক ঘোড়ার খুরের আওয়াজ যখন মুসলিমের কানে আঘাত করলো তিনি তখন তরবারি বের করে গৃহের বাইরে এলেন এবং শত শত ইয়াজিদ বাহিনীকে তরবারীর আঘাতে নিহত করলেন। নিরুপায় হয়ে ইয়াজিদ বাহিনীর সেনাপতি মোহাম্মাদ ইবনে আশআশ অতিরিক্ত সৈন্য সাহায্যের প্রার্থনা করলো। ইবনে জিয়াদ তার কাছে জানতে চাইলো যে, এক ব্যক্তির জন্য তিন হাজার সৈন্য কি কম? ইবনে আশ্আশ্ বার্তা দিল এই ভাষায় যে, “তুমি হয়তো বুঝেছ যে, আমরা কোন মুদীর দোকানদার অথবা জোলার সাথে যুদ্ধ করছি।” যখন কোন ভাবেই মুসলিমকে গ্রেফতার করা যাচ্ছিল না তখন তাকে যুদ্ধরত অবস্থায় একটি গর্তের মধ্যে ফেলে দিয়ে গ্রেফতার করা হয়। ইবনে জিয়াদ তাকে দারুল ইমারার ছাদ থেকে নীচে নিক্ষেপ করে মস্তক বিচ্ছিন্ন করার নির্দেশ দিল। হযরত মুসলিম তার অন্তিম ইচ্ছা জানালেন এবং ছাদ থেকে নিক্ষিপ্ত হওয়ার সময় তাঁর মুখ থেকে বেরিয়ে এলো, “আস্সালামু আলাইকা ইয়া আবা আব্দুল্লাহ।” এরপর তাঁর মস্তক দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দামেস্কে পাঠানো হলো এবং দেহকে প্রধান তোরণে ঝুলিয়ে দেয়া হলো। অন্য একটি বর্ণনায় জানা যায় যে, তাঁর এবং হানির পায়ে দড়ি বেঁধে লাশকে বাজারে এবং রাজপথে ঘুরানো হয়। পরে বনু নদ্হজ গোত্রের লোকেরা লাশ সমাহিত করে।###

Share: