সংকলনেঃ মোঃ কবির হোসেন
“ইবনে বাবুবিয়া” যিনি একজন প্রথিত যশা আলেমে দ্বীন হিসেবে সুখ্যাত তিনি একটি অতি নির্ভরযোগ্য ও বিশ্বস্ত রেওয়ায়েত জাবির ইবনে আব্দুল্লাহ আনসারী (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন, রাসুল (সাঃ) এরশাদ করেছেন, আমি হযরত আদম সদৃশ এক মানব সন্তান এবং হযরত ইব্রাহীম (আঃ) এর সৃষ্টি প্রকৃতি ও চারিত্রিক গুণগত দিক থেকে আমার সদৃশ ছিলেন। আল্লাহপাক তার সুউচ্চ আরশ হতে দশটি নাম ধরে আমাকে আহ্বান করলেন এবং আমার গুণাবলীকে স্পষ্ট করে দিলেন আর প্রত্যেক পয়গাম্বরদের মাধ্যমে আমার আগমনের সুবার্তা পৌঁছে দিতে নির্দেশ প্রদান করলেন। (সুত্রঃ হায়াতুল কুলুব, পয়গাম্বর এর প্রসিদ্ধ নামসমূহ, লেখকঃ আল্লামা মাজলিসি)
হযরত ইব্রাহীম (আঃ) এর সহিফায় (গ্রন্থে) রাসুল (সাঃ) এর নামসমূহঃ
হযরত ইমাম বাকির (আঃ) থেকে বর্ণিত, হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ) এর নাম ইব্রাহীম (আঃ) এর সহিফায় “মাহি”, তাওরাতে “হাদ”, ইঞ্জিলে “আহমদ” এবং পবিত্র কোরআনে “মুহাম্মাদ” রয়েছে। ইমাম বাকির (আঃ)কে জিজ্ঞাসা করা হলো, “মাহি” অর্থে কি বুঝানো হয়েছে? উত্তরে ইমাম বলেন, “মাহি” অর্থাৎ, মূর্তির মূলোৎপাটনকারী। জুয়ী, গান, বাজনা এবং সমস্ত প্রকার মিথ্যা প্রভুর বিনাশকারী।
“হাদ” অর্থাৎ যে আল্লাহ ও তার দ্বীনের প্রতি শত্রুতা পোষণ করে তার প্রতি শত্রুতা পোষণকারী। চাই সে তার আত্মীয়দের মধ্য থেকে হোক বা তার অপরিচিত হোক।
“আহমাদ” অর্থাৎ, আল্লাহ তাঁকে প্রশংসিত স্থানে অধিষ্ঠিত করেছেন। তাঁর জন্য যা কিছুই গ্রহণযোগ্য সেই উত্তম কর্মই তাঁর থেকে সংঘটিত হয়েছে।
“মুহাম্মাদ” এজন্য যে, আল্লাহ ফেরেশতাকূল সমস্ত পয়গাম্বরগণ এবং রাসুল (সাঃ) এর উম্মতগণ তাঁর প্রশংসায় পঞ্চমুখ, তার উপর দরুদ প্রেরণ করে থাকেন এমনকি তাঁর নাম আরশের উপর মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ হিসাবে লিখা রয়েছে। (সূত্রঃ শেখ সুদুক, আমালী গ্রন্থ, পৃঃ ৬৭, মাল্লা ইয়াহাযারুল ফাকিহ, খঃ ৪, পৃঃ ১৭৭)
তাওরাত, ইঞ্জিল, যবুর কিতাবে পয়গাম্বর (সাঃ) এর নামসমূহ বিদ্যমান সম্পর্কে তিনি নিজেই এরশাদ করেছেন, আল্লাহপাক তাওরাতে ও ইঞ্জিলে আমার নামকে অধিক বার উল্লেখ করেছেন তাঁর কালামে পাক আমায় শিক্ষা দিয়েছেন এবং আমাকে উর্ধ্ব গগণে ভ্রমন করিয়েছেন। আমার নাম আল্লাহর মহীমাময় নাম থেকে উৎপত্তি লাভ করেছে। স্রষ্টার একটি নাম হলো “মাহমুদ” তার থেকে আমি হলাম “মুহাম্মাদ” এবং আমাকে সর্বোৎকৃষ্ট যুগে ও সর্বশ্রেষ্ঠ জাতির মাঝে আবির্ভূত করেছেন। তাওরাতে আমাকে “আহমাদ বলে সম্বোধন করা হয়েছে কারণ যারাই আমার উম্মতের মাঝে সেই একক সত্ত্বার উপাসনাকারী তাদের উপর থেকে জাহান্নামের আগুন হারাম ঘোষণা করা হয়েছে।
ইঞ্জিলে আমাকে “আহমদ” নামে ডাকা হয়েছে। কেননা, আমি প্রশংসিত এবং আমার উম্মত প্রশংসাকারী।
যবুরে আমাকে “মাহি” নামে স্বরণ করা হয়েছে কারণ আমার কারণে জমিনে মুর্তি পুজাকে বিনষ্ট করা হয়েছে।
পবিত্র কোরআনে আমাকে “মুহাম্মাদ” বলে সম্মোধন করা হয়েছে। কেননা, পুণরুত্থান দিবসে উম্মতগণ আমার প্রশংসায় মশগুল থাকবেন এবং ঐ দিন আমি হব শাফায়েতকারী।
পবিত্র কোরআনে পয়গাম্বর (সাঃ) এর নামসমূহঃ
অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য একটি রেওয়ায়েত ইমাম সাদিক (আঃ) থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, এরকম দশটি প্রসিদ্ধ নাম কোরআনে পয়গাম্বর (সাঃ) সম্পর্কে বর্ণিত হয়েছে।
(ক) মুহাম্মাদঃ মুহাম্মাদ একজন রাসুল মাত্র; তাঁর পূর্বে বহু রাসুল গত হয়েছে। সুতরাং যদি সে মারা যায় অথবা সে নিহত হয় তবে তোমরা কি পৃষ্ঠপ্রদর্শন করবে? এবং কেউ পৃষ্ঠপ্রদর্শন করলে সে কখনও আল্লাহর ক্ষতি করবে না। বরং আল্লাহ শীঘ্রই কৃতজ্ঞদেরকে পুরস্কৃত করবেন। (সূরা ইমরানঃ ১৪৮)
(খ) আহমাদঃ স্মরণ কর, মারইয়াম তনয় ঈসা বলে ছিল যে, ‘হে বনী ইসরাঈল! আমি তোমাদের নিকট আল্লাহর রাসুল এবং আমার পূর্ব হতে তোমাদের নিকট যে তাওরাত রয়েছে আমি তাঁর সমর্থক এবং আমার পরে আহমাদ নামে যে রাসুল আসবে আমি তার সুসংবাদ দাতা।’ (সূরা সাফ্ফঃ ৬)
(গ) আব্দুল্লাহঃ আর এই যে আল্লাহর বান্দা (আব্দুল্লাহ) তাকে ডাকার জন্য দন্ডায়মান হল তখন তারা তাঁর নিকট ভীড় জমাল। (সূরা জ্বীনঃ ১৯)
(ঘ) তা হাঃ তা হা তুমি ক্লেশ পাবে এজন্য আমি তোমার প্রতি কোরআন অবতীর্ন করিনি। (সূরা তা হাঃ ১ থেকে ২)
(ঙ) ইয়াসীনঃ ইয়াসীন শপথ জ্ঞানগর্ভ কোরআনের (সূরা ইয়াসীনঃ ১ থেকে ২)
(চ) নুনঃ নুন শপথ কলমের এবং তারা যা লিপিবদ্ধ করে তার। (সূরা কালামঃ ১)
(ছ) মুযাম্মিলঃ হে বস্ত্রাবৃত! (মুযাম্মিল) (সূরা মুযাম্মিলঃ ১)
(জ) মুদাছ্ছিরঃ হে বস্ত্রাচ্ছাদিত!
(ঝ) রাসুলঃ অতঃপর তোমাদের কাছে যা আছে তার সমর্থকরূপে যখন একজন রাসুল আসবে তখন তোমাদের অবশ্যই তার প্রতি ঈমান আনবে এবং তাঁকে সাহায্য করবে। (সূরা ইমরানঃ ৮১)
(ঞ) যিক্রঃ নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের প্রতি অবতীর্ণ করেছেন যিক্রকে। (সূরা তালাকঃ ১০)
অতঃপর ইমাম সাদিক বলেন, যিকর পয়গাম্বর (সাঃ) এর নামের মধ্যে একটি নাম আর আমরা হলাম আহলে যিকর যাদের সম্পর্কে আল্লাহ তার কালামে পাকে এরশাদ করেছেন, তোমরা যা সম্পর্কে অবগত নও তা আহলে যিকর থেকে জিজ্ঞেস করে নাও। (সূত্রঃ বাসায়েরুদ দারাজাতঃ ৫১৪)
পুনরুত্থান দিবসে পয়গাম্বর (সাঃ) এর নামসমূহঃ
পয়গাম্বর (সাঃ) এ সম্পর্কে এরশাদ করেছেন, কিয়ামত দিবসে আমাকে “হাশর” নামে ডাকা হবে কেননা, এ যুগ কিয়ামত দিবসের দিকে ধাবমান। আমাকে “মাওফিক” নামে ডাকা হবে কারণ ঐ দিন আমি জনগণ থেকে হিসাব নিকাশ আদায় করব। আমাকে “আকিব” নামে আহ্বান করা হবে কারণ সকল পয়গাম্বরদের শেষে আমাকে প্রেরণ করা হয়েছে এবং আমার পর কোন পয়গাম্বর (আঃ) প্রেরণ করা হবে না।
আমি হলাম “মাক্ফি” আম্বিয়াদের পরম্পরায় পরিশেষে আমি আগমন করি। আমি হলাম “কাছিম” অর্থাৎ পরম পূর্ণতা ও উৎকর্ষতার অধিকারী। আমার প্রতিপালক আমার উপর অনুগ্রহ করার পর বলেন, হে মুহাম্মাদ! আমি প্রত্যেক পয়গাম্বরদের স্বীয় জাতির ভাষা দিয়ে প্রেরণ করেছি আর তাঁরা শুধুমাত্র ঐ ভাষাই কথা বলত। আর তোমাকে কি কৃষাঙ্গ কি শেতাঙ্গ প্রত্যেক জাতির জন্য পাঠিয়েছি। তোমার ভয় মানুষের অন্তরে স্থাপন করে দিয়েছি যা পূর্বে কোন পয়গাম্বরদের দেয়া হয়নি। কাফিরদের থেকে অর্জিত গণিমাতের মাল তোমার উপর হালাল ঘোষণা করা হয়েছে যার পূর্বে কোন নবীগণের উপর হালাল ছিল না। তোমাকে এবং তোমার উম্মতদেরকে আরশের গুপ্ত ধনভান্ডার ফাতেহাতুল কিতাব এবং সুরা বাকারার শেষোক্ত আয়াত দান করেছি। ভূমিকে করিছি সিজদার স্থান। যার পূর্বে পূর্ববর্তী উম্মতগণ তাদের উপাসনালয়ে গিয়ে ইবাদাতের কর্মকে সম্পাদন করতেন এবং ভূমির মাটিকে তোমাদের জন্য পবিত্রকারী হিসাবে নির্ধারণ করেছি।
“আল্লাহু আকবার” এর মত পবিত্র ধ্বনীকে তোমার ও তোমার উম্মতের জন্য দান করেছি। তোমার নামকে আমার নামের পাশাপাশি উল্লেখ করেছি। যখন তোমার উম্মতগণ আমাকে এককসত্তা হিসাবে স্বরণ করবে পাশাপাশি তোমার নামকেও স্বরণ করবে।
“তুবা” (বেহেশতের একটি গাছের নাম) তোমার ও তোমার উম্মতদেরকে দান করা হবে। (এলালুশ শারায়ে, পৃঃ ১২৮)
রেওয়ায়েতে পয়গাম্বর (সাঃ) এর নামসমূহঃ
একটি নির্ভরযোগ্য হাদীস বর্ণিত হয়েছে যে, একদিন একদল ইয়াহুদী রাসুল (সাঃ) এর নিকট আগমন করল। তারপর রাসুল (সাঃ)কে জিজ্ঞাস করল, কি কারণ রয়েছে যে আপনাকে “মুহাম্মাদ” “আহমাদ” “আবুল কাসিম” “বাশির” “নাযির” “দায়ি” ইত্যাদি নাম দ্বারা সম্বোধন করা হয়েছে?
উত্তরে তিনি বলেন, জমিনে আমাকে প্রশংসিত স্থানে অধিষ্ঠিত করা হয়েছে এজন্য “মুহাম্মাদ” বলা হয়েছে। আসমানে আমার গুণকীর্তন করা হয়েছে বলে আমাকে “আহমাদ” বলা হয়েছে। জান্নাত ও জাহান্নামের মালিক কিয়ামত দিবসে আমি, তাই আল্লাহ আমার নাম আবুল কাসিম বলেছেন। অতীতে ও বর্তমানে যারা আমাকে অস্বীকার করেছে তাদেরকে জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত করা হবে এবং যারা আমাকে আমার নবুয়্যাতের সাক্ষ্য দান করেছে তাদেরকে জান্নাত দান করা হবে।
যেহেতু আমি জনগণকে দ্বীনের প্রতি আহ্বানকারী তাই আমাকে “দায়ি” বলে সম্বোধন করা হয়েছে আর আমার অস্বীকারকারীদেরকে ভয় ভীতি প্রদর্শনকারী তাই আমাকে নাযির বলা হয়েছে।
আল্লাহর পক্ষ হতে তার বান্দাদের জান্নাতের সুসংবাদদানকারী তাই আমাকে “বাশির” বলে ডাকা হয়েছে। (মানিয়ুল আখবার, পৃঃ ৫১)
হাসান বিন ফাসযাল নামক জনৈক ব্যক্তি ইমাম রেজা (আঃ)কে পয়গাম্বর (সাঃ) এর কুনিয়াত আবুল কাসিম সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে ইমাম উত্তরে তাকে বলেন, যেহেতু রাসুল (সাঃ) এর সন্তানের নাম ছিল কাসিম। অতঃপর ইমাম বলেন, তুমি কি অবগত নও, যে রাসুল (সাঃ) এরশাদ করেছেন, আমি ও আলী হলাম এ উম্মতের পিতা।
আমি বললাম, হ্যাঁ, এ সম্পর্কে অবগত রয়েছি।
ইমাম বলেন, তুমি কি জাননা আলী (আঃ) হলেন জান্নাত ও জাহান্নামের বন্টনকারী?
আমি বললাম এও জানি।
ইমাম বলেন, যেহেতু পয়গাম্বর (সাঃ) জান্নাত ও জাহান্নাম বন্টনকারীর পিতা তাই তাকে “আবুল কাসিম” বলে আখ্যায়িত করেছেন। আমি পূনরায় জিজ্ঞাসা করলাম, তিনি সকলের পিতা এর তাৎপর্য কি?
ইমাম বলেন, রাসুল (সাঃ) এর আন্তরিকতা এ উম্মতের প্রতি ঐরূপ যেরূপ একজন পিতার আন্তরিকতা তার সন্তানের প্রতি থাকে। আর আলী (আঃ) হলেন রাসুল (সাঃ) এর সর্বোত্তম উম্মত এবং রাসুল (সাঃ) এর পর এ উম্মতের প্রতি আলী (আঃ) এর আন্তরিকতা সবচেয়ে বেশি। কারণ তিনি রাসুল (সাঃ) এর ওসি, স্থলাভিষিক্ত, উত্তরসূরী এবং পথপ্রদর্শক। সুতরাং তাই রাসুল (সাঃ) এরশাদ করেছেন, আমি ও আলী এই উম্মতের পিতা।
আরেকটি হাদীস ইমাম বাকের (আঃ) থেকে বর্ণিত যে, পয়গাম্বর (সাঃ) এর দশটি প্রসিদ্ধ নাম রয়েছে। যার পাঁচটি নাম কোরআনে এসেছে যেমন, মুহাম্মাদ, আহমাদ, আব্দুল্লাহ, ইয়াসীন এবং নুন। অপর পাঁচটি নাম কোরআনে আসেনি যেমন, ফাতেহ, খাতাব, কাফি, মাক্কি, হাশর ইত্যাদি। (খেসাল, পৃঃ ৪২৪)
আলী ইবনে ইবরাহীম পয়গাম্বর (সাঃ) এর মুজাম্মেল ও মুদাছছির নাম সম্পর্কে মাসুমিনদের থেকে একটি রেওয়ায়েত বর্ণনা করেছেন, আল্লাহ পয়গাম্বরকে মুজাম্মেল এজন্য বলেছেন যখন ওহি তার উপর নাযিল হত নিজেকে তখন পোষাক দ্বারা আবৃত করে ফেলতেন, মুদাছছির এজন্য যে, কিয়ামতের পূর্বে প্রত্যাবর্তন সম্পর্কে অর্থাৎ, হে মহান ব্যক্তি কাফন থেকে বেরিয়ে আস, এবং উঠ পুনরায় জনগণকে আল্লাহর ভয় দেখাও। (সূত্র ঃ তাফসিরে কুমি, খঃ ২, পৃঃ ৩৯৩)
কিছু কিছু আলেমে দ্বীন পয়গাম্বর (সাঃ) এর প্রায় চারশত নাম কোরআন থেকে বের করেছেন। তার মধ্যে প্রসিদ্ধতম নাম ও লাকাবগুলি হলো শাহেদ, শাহীদ, মুবাশশির, বাশির, নাযির, দায়ি, সিরাজুম মুনির, রাহমাতুল্লিল আলামীন, রাসুলুল্লাহ, খাতামুননাবিয়িন, নাবীয়ে উম্মি, নুর, নিয়ামত, রাউফ, রাহীম, মুনাযির, মুয়াককির, শামস, নাজম, হাম সামা, ত্বীন। (মানাকিবে ইবনে শাহরে আশুব, খঃ ১, পৃঃ ১৯৫) (সূত্রঃ মুহাম্মাদ (সাঃ) রায়ে অফরিনিশ, লেখকঃ সৈয়দ জাওয়াদ হাশেমী, প্রকাশকঃ আয়াতে বায়্যেনাত, পৃঃ ৮১ থেকে ৮৫, ফার্সী থেকে বাংলায় অনুবাদকৃত)