১৬ ডিসেম্বর। স্বাধীনতা যুদ্ধে চূড়ান্ত বিজয় অর্জনের মধ্যে দিয়ে ১৯৭১ সালের এই দিনে বাংলাদেশ একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। এ বিজয় ও স্বাধীনতা সহজে বা অল্প সময়ে অর্জিত হয়নি। এর পেছনে রয়েছে রাজনৈতিক দল, নেতৃবৃন্দ ও ছাত্র জনতার দীর্ঘ সংগ্রাম ও আত্মত্যাগ রয়েছে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের অসমসাহসী যুদ্ধ। লাখ লাখ নারী ও পুরুষ তাদের জীবন দিয়েছেন স্বাধীনতার জন্য। শুধু ১৯৭১ সালে নয়, স্বায়ত্তশাসনসহ স্বাধীনতা সংগ্রামের বিভিন্ন পর্যায়েও ত্যাগ স্বীকার করেছেন অসংখ্য মানুষ। আজকের দিনে আমরা তাই স্বাধীনতা যুদ্ধের সকল শহীদদের অত্যন্ত সম্মানের সঙ্গে স্মরণ করি। তাদের উদ্দেশ্যেও সম্মান জানাই, বাংলাদেশকে স্বাধীন করার সংগ্রামে যারা নানাভাবে ত্যাগ স্বীকার করেছেন এবং নির্যাতিত ও ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছেন। আমরা বিশেষ করে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্ব ও আত্মত্যাগের কথা স্মরণ করি গর্ব ও কৃতজ্ঞতার সঙ্গে। কারণ তারা অত্যাধুনিক অস্ত্র সস্ত্র সজ্জিত ও প্রচন্ড শক্তিশালী পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে সাধারণ অস্ত্র নিয়ে যুদ্ধ করে স্বাধীনতা ছিনিয়ে এনেছেন বাস্তবে তারা অসম্ভবকে সম্ভব করেছেন। আর এটা সম্ভব হয়েছিল আসলে তাদের দেশপ্রেমের কারণে। আজকের দিনে সংগ্রামে ও নির্যাতিত রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের অবদানের কথাও স্মরণ করা দরকার। ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত যারা স্বাধীনতামুখী স্বায়ত্ত¡শাসনের পর্যায়ক্রমিক আন্দোলনকে এগিয়ে নিয়েছেন এবং সকল প্রতিকূলতার মোকাবেলা করে স্বাধীনতা ও বিজয়কে অবশ্যম্ভাবী করেছেন। প্রসঙ্গক্রমে মনে রাখতে হবে যে, বাংলাদেশের স্বাধীনতা কারো একক অর্জন নয় বরং স্বল্পসংখ্যক ব্যতিক্রম ছাড়া স্বাধীনতা অর্জনের কৃতিত্ব এদেশের সকল মানুষের।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের রয়েছে দীর্ঘ পটভূমি। আজকের বাংলাদেশ ছিল ১৯৪৭ সালের ১৪ আগষ্ট প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্র পাকিস্তানের প্রদেশ পূর্ব বাংলা, পরবর্তীকালে পূর্ব পাকিস্তান। শিক্ষা, চাকুরী, ব্যবসা বানিজ্য ও শিল্প কারখানাসহ সকল বিষয়ে অবহেলিত, বঞ্চিত ও শোষিত প্রদেশ পূর্ব পাকিস্তান এর শিক্ষা, চাকুরী, শিল্প, ব্যবসা ও অর্থনৈতিক অধিকারসহ পূর্ণ আঞ্চলিক স্বায়ত্ত¡শাসনের দাবীতে বিকশিত সংগ্রামের চূড়ান্ত পর্যায়ে জাতি ১৯৭১ সালের মার্চে স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়েছিল। ১৯৬০ এর দশকের শেষ পর্যন্ত স্বায়ত্ত¡শাসনের দীর্ঘ সে সংগ্রামে নেতৃত্ব দিয়েছেন মজলুম জননেতা মাওঃ আব্দুল হামিদ খান ভাসানী। ছাত্র সমাজের ১১ দফার ভিত্তিতে গড়ে ওঠা ১৯৬৯ এর গণঅভ্যুত্থানের মধ্য নিয়ে এর পরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান প্রধান নেতায় পরিণত হয়েছেন। স্বাধীনতা যুদ্ধের আশু কারণও তাকে কেন্দ্র করেই সৃষ্টি হয়েছিল। ১৯৭০ সালের ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত পাকিস্তানের প্রধান সাধারণ নির্বাচনে স্বায়ত্ত¡শাসনের দাবী নিয়ে শেখ মুজিবরের নেতৃত্বে অগ্রসরমান দল আওয়ামী লীগ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে। কিন্তু সুচিন্তিতভাবে সংকট সৃষ্টির মাধ্যমে আবারও পূর্ব পাকিস্তান এর জনগণকে বঞ্চিত করার পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। প্রতিবাদে ১৯৭১ সালের ১লা মার্চ ছাত্র জনতা স্বাধীনতার দাবী ও আহব্বান উচ্চারণ করেছে। প্রধান নেতা শেখ মুজিব সামরিক প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান ও পশ্চিম পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ দল পিপলস পার্টির নেতা জুলফিকার আলী ভুট্টোর সঙ্গে আলোচনায় অংশ নিয়েছেন। কিন্তু প্রমাণিত হয়েছে যে, পাকিস্তান সেনাবাহিনী গণহত্যা শুরু করার প্রস্তুতি হিসাবেই শেখ মুজিবকে আলোচনায় ব্যস্ত রেখেছিল। আক্রমণ এসেছে ২৫শে মার্চ রাতে। প্রধান নেতা শেখ মুজিবকে পাকিস্তানীরা গ্রেফতার করেছে, আওয়ামী লীগের অন্য নেতারা ভারতে আশ্রয় নিয়েছে। জাতির সে দুঃসময়ে ২৭শে মার্চ স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছেন তৎকালীন মেজর জিয়াউর রহমান। ছাত্র জনতার প্রতিরোধ যুদ্ধ শুরু হয়েছে। ওদিকে ভারতের পশ্চিম বঙ্গের রাজধানী কোলকাতায় গঠন করা হয়েছে স্বাধীন বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকার। পাকিস্তান বিরোধী নীতি কৌশলের পাশাপাশি বাংলাদেশকে ইচ্ছাধীন রাষ্ট্র বানানোর পরিকল্পনার ভিত্তিতে ভারত স্বাধীনতা যুদ্ধে সীমিত আকারে সাহায্য করেছে, ডিসেম্বরে এসে একেবারে শেষ পর্যায়ে ভারতের সেনাবাহিনী যুদ্ধেও অংশ নিয়েছে। কিন্তু ভারতের এই অংশগ্রহণ সত্তে¡ও সত্য হলো, স্বাধীনতাকে অনিবার্য করেছে বাংলাদেশের ছাত্র জনতা এবং মুক্তিযোদ্ধাদের অসম সাহসী যুদ্ধই পাকিস্তানের সেনাবাহিনীকে পরাজিত করেছে। রক্তক্ষয়ী ও সর্বাত্মক সে যুদ্ধের মধ্য দিয়ে চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত হয়েছিল ১৬ ডিসেম্বর। দিনটিকে তাই বিজয় দিবস হিসাবেই পালন করা হয়।
আমরা অবশ্য গৌরবোজ্জ্বল এ দিনটিকে কেবলই আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার পক্ষপাতী নই। আমার বরং জনগণের আকাঙ্খা ও প্রাপ্তির হিসাব মেলানোকে বেশী গুরুত্বপূর্ণ মনে করি। কারণ স্বাধীনতা অর্জনের পরেও অর্থনৈতিক মুক্তি অর্জনের প্রধান উদ্দেশ্য এখনো অপূর্ণ রয়ে গেছে।###